সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা আফ্রিকা ও ইউরেশিয়ার জীবাশ্ম রেকর্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ শূন্যতা তুলে ধরে। যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি ও চীনের একদল বিজ্ঞানী প্রস্তাব করেছেন, ৮,০০,০০০ থেকে ৯,০০,০০০ বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষদের জনসংখ্যা ভয়াবহ সংকটে পড়ে। গবেষকদের মডেল অনুযায়ী, মাত্র ১,২৮০ জন প্রজননক্ষম ব্যক্তি এই সংকটময় সময়কালে টিকে ছিল, যা প্রায় ১,১৭,০০০ বছর স্থায়ী হয়। এই গবেষণা ইঙ্গিত করে যে, এই সংকটের শুরুতে প্রায় ৯৮.৭% পূর্বপুরুষ হারিয়ে যায়, যা মানব বিবর্তনের গতিপথকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে ।
এই জনসংখ্যাগত বিপর্যয় প্রাথমিক থেকে মধ্য প্লেইস্টোসিন যুগে পরিবর্তনের সাথে মিলে যায়, যা জলবায়ু ও পরিবেশগত বিশাল পরিবর্তনের সময়কাল। পরবর্তী প্লেইস্টোসিন যুগে আধুনিক মানুষ আফ্রিকার বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। নিঅ্যান্ডারথালের মতো অন্যান্য মানব প্রজাতি বিলুপ্ত হয় এবং প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকায় মানুষের পদচিহ্ন পড়ে। এই সময়ে বিশাল হিমবাহ পৃথিবীর ভূমিরূপ পরিবর্তন করে, যা বর্তমানে দৃশ্যমান অনেক ভৌগোলিক গঠন তৈরি করে। এই নতুন গবেষণা মানব অস্তিত্বের সংকট ও বিবর্তন কিভাবে একে অপরকে প্রভাবিত করেছে তা ব্যাখ্যা করে।
ফাস্ট ইনফিনিটিসিমাল টাইম কোঅ্যালেসেন্ট প্রসেস (FitCoal) নামে একটি নতুন জিনগত বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এই পদ্ধতি আধুনিক মানব জিনোমের ৩,১৫৪টি নমুনা বিশ্লেষণ করে প্রাচীন জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরে। গবেষণার সহ লেখক এবং ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস হেলথ সায়েন্স সেন্টারের জিনতাত্ত্বিক ইউন-সিন ফু বলেন, “ঋরঃঈড়ধষ এত পুরনো ও কঠিন সংকট শনাক্ত করতে পারে, যা একটি বড় অগ্রগতি।” গবেষকরা ১০টি আফ্রিকান ও ৪০টি নন-আফ্রিকান জনগোষ্ঠীর জিনোম বিশ্লেষণ করেন এবং দেখেন যে, এই সংকটের ফলে মানব জিনগত বৈচিত্র্যের ৬৫.৮৫ শতাংশ হারিয়ে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে কম সংখ্যক মানুষের টিকে থাকা মানব প্রজাতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তবে এটি বিবর্তনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
প্যালিওঅ্যানথ্রোপোলজির একটি দীর্ঘদিনের রহস্য ছিল, কেন আফ্রিকা ও ইউরেশিয়ার জীবাশ্ম রেকর্ডে এই সময়ের নিদর্শন খুব কম।গবেষকদের মতে, এই জনসংখ্যাগত সংকট সেই শূন্যতার কারণ হতে পারে। গবেষণার সহ-লেখক এবং সাপিয়েঞ্জা ইউনিভার্সিটির নৃতত্ত্ববিদ জর্জিও মানজি বলেন, “আফ্রিকা ও ইউরেশিয়ার জীবাশ্ম রেকর্ডের শূন্যতা এই সংকটের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। এটি প্রস্তাবিত সংকটময় সময়ের সাথে পুরোপুরি মিলে যায়।” এই সংকটের পেছনের কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল চরম জলবায়ু পরিবর্তন।এই সময়ে তাপমাত্রা নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়, দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দেয় এবং খাদ্যের অভাব দেখা দেয়। ম্যামথ, মাস্টোডন ও বিশালাকৃতির অলস প্রজাতির বিলুপ্তি খাদ্যের সরবরাহকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে, যা মানুষের টিকে থাকার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
যদিও এই সংকট মানুষের জিনগত বৈচিত্র্য হ্রাস করেছিল, এটি মানব বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হয়ে উঠেছিল। গবেষণা অনুযায়ী, এই সংকট একটি প্রজাতিকরণ ঘটনা (speciation event) সৃষ্টি করতে পারে, যেখানে একক পূর্বপুরুষ থেকে দুটি বা তার বেশি নতুন প্রজাতি বিকশিত হয়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই সময়ে দুটি পূর্বপুরুষীয় ক্রোমোজোম একত্রিত হয়ে আধুনিক মানুষের ২ নম্বর ক্রোমোজোম গঠন করেছিল। ২ নম্বর ক্রোমোজোম মানুষের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রোমোজোম, যার মধ্যে ২৪৩ মিলিয়ন ডিএনএ বেস পেয়ার রয়েছে। এই পরিবর্তন আমাদের আধুনিক মানুষকে (হোমো সেপিয়েন্স), নিঅ্যান্ডারথাল এবং ডেনিসোভানদের শেষ সাধারণ পূর্বপুরুষের সাথে সংযুক্ত করে।
এই আবিষ্কার মানব বিবর্তন গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। গবেষকরা এখন প্রশ্ন করছেন, এই সংকটকালে মানুষ কোথায় বাস করেছিল? তারা কীভাবে চরম জলবায়ুর সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল? সংকট কি মানব মস্তিষ্কের বিবর্তন ত্বরান্বিত করেছিল?গবেষণার সহ-লেখক এবং ইস্ট চায়না নরমাল ইউনিভার্সিটির বিবর্তন ও কার্যকরী জিনতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ ইয়ি-হুয়ান প্যান বলেন, “এই নতুন আবিষ্কার মানব বিবর্তনে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করছে, যেমন এই লোকেরা কোথায় বাস করেছিল, তারা কীভাবে বিপর্যয় কাটিয়ে উঠেছিল এবং এই সংকট কি মানব মস্তিষ্কের বিকাশকে ত্বরান্বিত করেছিল।”
ভবিষ্যতের গবেষণাগুলো সম্ভবত প্রাচীন মানবদের টিকে থাকার কৌশল আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করবে। কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন, এই সময়ে আগুন নিয়ন্ত্রণ করার দক্ষতা অর্জন মানুষকে উষ্ণতা, সুরক্ষা এবং খাদ্য প্রস্তুতির নতুন উপায় তৈরি করতে সহায়তা করেছিল।জলবায়ু ধীরে ধীরে মানুষের জন্য অনুকূল হতে শুরু করলে, প্রায় ৮,১৩,০০০ বছর আগে মানব জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই গবেষণা আধুনিক মানুষের বিবর্তন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে, তবে এটি কেবল শুরু। সাংহাই ইনস্টিটিউট অব নিউট্রিশন অ্যান্ড হেলথের তাত্ত্বিক জনসংখ্যা জিনতত্ত্ববিদ ও গণনামূলক জীববিজ্ঞানী লি হাইপেং বলেন, “এই গবেষণা কেবল সূচনা। ভবিষ্যতে আরও গবেষণার মাধ্যমে আমরা প্লেইস্টোসিনের এই গুরুত্বপূর্ণ সময় সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে পারবো, যা মানব পূর্বপুরুষ ও বিবর্তনের রহস্য উন্মোচনে সহায়ক হবে।”
প্রাচীন ডিএনএ, জীবাশ্ম রেকর্ড ও পরিবেশগত ডেটার আরও বিশদ গবেষণার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানতে পারবেন। যে সংকট একসময় মানব জাতির জন্য হুমকি ছিল, সেটিই হয়তো আমাদের জিনগত ও মানসিক বিকাশকে ত্বরান্বিত করেছে।


