১৯৭৭ সালে নাসা (NASA) পৃথিবী থেকে দুইটি মহাকাশযান পাঠিয়েছিল—ভয়েজার ১ ও ভয়েজার ২। সেসব যন্ত্রপাতি ছিল আমাদের সৌরজগতের গভীরে প্রবেশের সাহসী অন্বেষণ। আজ প্রায় আধা শতাব্দী পরও তারা কোটি কোটি মাইল পেরিয়ে মহাবিশ্বের অজানা গহ্বরে পা বাড়িয়ে চলছে।
১৯৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে নাসা উপলব্ধি করেছিল, ১২ বছর পর গ্রহগুলোর অবস্থান এমন হবে যে তারা সৌরজগতের বৃহৎ গ্রহগুলোকে পরপর পরিদর্শনের উপযুক্ত কক্ষপথে থাকবে। এটি ছিল একটি বিরল জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সুযোগ, যা সর্বশেষ পাওয়া যায় প্রায় ১৭৬ বছরে একবার। এই সুবর্ণ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভয়েজার মিশন পরিকল্পনা করা হয়। এর প্রধান লক্ষ্য ছিল বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন গ্রহগুলোকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করা।
এই প্রকল্পের আগের অংশ ছিল ‘পায়োনিয়ার’ মহাকাশযানগুলি, কিন্তু ভয়েজার ছিল অধিক শক্তিশালী, আধুনিক এবং দীর্ঘস্থায়ী। শুধু গ্রহের ছবি তোলা নয়, তাদের বায়ুমণ্ডল, চুম্বকীয় ক্ষেত্র, উপগ্রহ ও রশ্মি সম্পর্কিত বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করাই ছিল প্রধান উদ্দেশ্য।
ভয়েজার মহাকাশযান দুটি ডিজাইন করা হয়েছিল ১২ বছর ধরে কাজ করার জন্য, কিন্তু তারা আজ ৪৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এটি মূলত তাদের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও শক্তি ব্যবস্থার কারণে সম্ভব হয়েছে।
তাদের শক্তি সরবরাহের জন্য ব্যবহার করা হয় “রেডিওআইসোটোপ থার্মাল জেনারেটর” (RTG) — যা নিউক্লিয়ার বিকিরণ থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করে। এই শক্তি সরবরাহ তাদের অনবরত বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি চালিয়ে দেয়। তাছাড়া তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই উন্নত। তারা পৃথিবীর সাথে দুরদূরান্ত থেকে সংকেত আদান-প্রদান করতে পারে। এর জন্য নাসার ডিপ স্পেস নেটওয়ার্ক (Deep Space Network) ব্যবহার করা হয়, যা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত বৃহৎ ডিশ অ্যান্টেনার মাধ্যমে সংকেত গ্রহণ করে।
মজার দিক হলো, এই ভয়েজার মহাকাশযানগুলোর প্রযুক্তি আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগের! তাদের মেমরি মাত্র ৪ মেগাবাইট, যা আজকের স্মার্টফোনের তুলনায় নিতান্তই নগণ্য। তবু এত সীমাবদ্ধ প্রযুক্তি দিয়েই তারা আজও চালু আছে। মাঝে মাঝে সংকেত বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা যন্ত্রাংশ বন্ধ হয়ে যাওয়া নিয়ে সমস্যাও হতো, কিন্তু তারা নিজেই পুনরায় চালু হয়ে যায়— যেন একরকম ‘নিজেই জীবন ফিরে পাওয়া’!
আরেক মজার ব্যাপার হলো, এত বছর কেটে গেলেও তারা সূর্য থেকে মাত্র এক ‘লাইট-ডে’ দূরত্ব পেরিয়েছে, অথচ আমাদের কাছের নিকটতম তারকা প্রায় ৪ লাইট-ইয়ার দূরে! অর্থাৎ প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, মহাবিশ্বের বিস্তার আমাদের সামনে এক অসীম রহস্যই থেকে যায়। এসব তথ্য মহাকাশের রহস্য আর মানুষের সীমাবদ্ধতার মজার মেলবন্ধন সৃষ্টি করে।
ভয়েজার ২ ১৯৭৭ সালের ২০ আগস্ট পৃথিবী থেকে রওনা হয় এবং ভয়েজার ১ ৫ সেপ্টেম্বর। যদিও ভয়েজার ১ পরে পাঠানো হয়, এটি সৌরজগতের বাহিরে ভয়েজার ২-কে ছাড়িয়ে গেছে কারণ এটি একটি দ্রুত গতিতে রওনা হয়েছিল।
প্রথম গন্তব্য ছিল বৃহস্পতি। ১৯৭৯ সালে, তারা বৃহস্পতির কাছে পৌঁছে বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ শুরু করে। বৃহস্পতির বিশাল ঘূর্ণায়মান বায়ুমণ্ডল, তার বিশাল লাল লোমকূপ এবং চারটি প্রধান উপগ্রহ আইও, ইউরোপা, গ্যানিমিড ও ক্যালিস্টো— এর অজানা তথ্য ভয়েজার থেকে এসেছে।
এরপর তারা শনি গ্রহের কক্ষপথে প্রবেশ করে, যেখানে তাদের ক্যাসিনি মহাকাশযানের পূর্বসূরী হিসেবে কাজ করেছিল। শনির অমর্যাদিত রিং সিস্টেম, তার উপগ্রহ টাইটান এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে অজানা অনেক তথ্য এই মহাকাশযান থেকে পাওয়া গেছে।
ভয়েজার ২ এর পরবর্তী গন্তব্য ছিল ইউরেনাস এবং নেপচুন। এটি ছিল প্রথম ও একমাত্র মহাকাশযান যা এই দুই গ্রহের কাছে পৌঁছেছে।ইউরেনাস ও নেপচুন সম্পর্কে আমাদের বর্তমান জ্ঞান প্রায় পুরোপুরি ভয়েজারের আবিষ্কৃত তথ্যের ওপর নির্ভরশীল।
ভয়েজারের অন্যতম আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য ছিল তাদের বহনকৃত “গোল্ডেন রেকর্ড”। এটি একটি সোনালী-তামার ডিস্ক, যার মধ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় নমস্কার, বিভিন্ন দেশের গান, প্রাণী ও প্রকৃতির শব্দ, মানুষের ছবি ও তথ্য সংরক্ষিত। ভাবনা ছিল যদি মহাবিশ্বে অন্য বুদ্ধিমান সভ্যতা এই মহাকাশযান পায়, তাহলে তারা মানব সভ্যতার সম্পর্কে ধারণা পাবে।
এই গোল্ডেন রেকর্ড মানবজাতির ঐতিহাসিক এক ডিজিটাল টাইম ক্যাপসুল। এটি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির এক মহাকাশিক প্রতীক, যে আমরা কেবল আমাদের পৃথিবীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নই, বরং মহাবিশ্বের এক অঙ্গ। বর্তমানে ভয়েজার ১ এবং ২ উভয়ই সৌরজগতের বাইরে, ইন্টারস্টেলার স্পেসে প্রবেশ করেছে। পৃথিবী থেকে তাদের দূরত্ব ক্রমাগত বাড়ছে— ভয়েজার ১ এর দূরত্ব প্রায় ১৬ বিলিয়ন কিলোমিটার (প্রায় ১০০ বিলিয়ন মাইল)। তারা এখনও সংকেত পাঠাচ্ছে, যদিও সংকেতগুলো পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় ২০ ঘণ্টার মতো।তাদের যন্ত্রপাতি ধীরে ধীরে পুরোনো হচ্ছে এবং শক্তি সংকটের কারণে নাসা কিছু বৈজ্ঞানিক যন্ত্র বন্ধ করেছে। তবে অন্তত ২০২৫ সাল পর্যন্ত তারা তথ্য পাঠানো চালিয়ে যাবে বলে আশা করা হয়। ভয়েজার মিশন আমাদের জন্য শুধুমাত্র সৌরজগতের রহস্য উন্মোচন করেনি বরং মহাবিশ্ব সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসা ও কৌতূহলের এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। এই যাত্রা আমাদের শেখায় জ্ঞানের জন্য মানুষের এক অনন্ত যাত্রা কখনো থামে না।


