পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন ও তার গতিবিধি নিয়ে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন। পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল বা কোরকে সাধারণত সম্পূর্ণ সিল করা এবং বাইরের স্তরের সাথে কোনো উপাদানের আদান-প্রদান হয় না এমন ধারণা ছিল। কিন্তু জার্মানির গটিঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক গবেষণায় এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে। তারা আবিষ্কার করেছেন যে, পৃথিবীর কোর থেকে স্বর্ণসহ অন্যান্য মূল্যবান ধাতু ম্যান্টলের মধ্য দিয়ে উপরের দিকে আসছে এবং আগ্নেয়গিরির লাভার সঙ্গে পৃথিবীর পৃষ্ঠে পৌঁছাচ্ছে।
গটিঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-রসায়ন বিভাগের ড. নিলস মেসলিং ও প্রফেসর ম্যাথিয়াস উইলবল্ড নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় হাওয়াই দ্বীপের আগ্নেয়গিরির লাভা শিলায় রুথেনিয়াম (Ruthenium, Ru) নামক বিরল ধাতুর আইসোটোপ ১০০Ru এর উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। এই আইসোটোপটি পৃথিবীর কোরে ম্যান্টলের তুলনায় বেশি পরিমাণে থাকে, যা প্রমাণ করে যে এই লাভা কোর-ম্যান্টল সীমান্ত থেকে উঠে এসেছে।
গবেষকরা উন্নত বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করে এই সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলি শনাক্ত করতে পেরেছেন, যা পূর্বে সম্ভব ছিল না। তাদের তথ্য অনুযায়ী, কোর থেকে উঠে আসা সুপার-হিটেড ম্যান্টল উপাদান কয়েক শত কোটি কোটি মেট্রিক টন পরিমাণে পৃথিবীর পৃষ্ঠে উঠে আসে এবং হাওয়াইয়ের মত মহাসাগরীয় দ্বীপ গঠন করে।
এই আবিষ্কার পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠনের উপর দীর্ঘদিনের ধারণাকে পুনর্বিবেচনার সুযোগ করে দিয়েছে। পূর্বে ধারণা করা হতো যে কোর সম্পূর্ণ সিল করা এবং বাইরের স্তরের সাথে কোনো উপাদান বিনিময় হয় না। কিন্তু এই গবেষণায় দেখা গেছে, কোর থেকে কিছু পরিমাণে ধাতু ম্যান্টলের মধ্য দিয়ে উঠে আসছে, যা পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গতিবিধির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
এছাড়া এই তথ্য মূল্যবান ধাতুর উৎস ও তাদের ভূতাত্ত্বিক বন্টন বোঝার ক্ষেত্রে নতুন দিক নির্দেশ করছে। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য শক্তি খাতসহ বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহৃত স্বর্ণ ও অন্যান্য ধাতুর উৎপত্তি ও প্রাপ্যতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
এই আবিষ্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও পৃথিবীর কোর থেকে সরাসরি স্বর্ণ উত্তোলনের সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ পৃথিবীর ৯৯.৯৯৯% স্বর্ণ এখনও প্রায় ২,৯০০ কিলোমিটার গভীরে মানুষের নাগালের বাইরে কঠিন শিলার নিচে আটকে আছে । তবে এই গবেষণা ভবিষ্যতে কোর-ম্যান্টল বিনিময় প্রক্রিয়া ও পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গতিবিধি সম্পর্কে আরও গভীর গবেষণার পথ প্রশস্ত করেছে। গবেষকরা আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে জানতে চান, এই লিকেজ প্রক্রিয়াটি বর্তমান যুগে সীমাবদ্ধ নাকি ভূতকালে দীর্ঘদিন ধরে চলমান ছিল। এর মাধ্যমে পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ বিবর্তন ও ভূতত্ত্বের নতুন ধারণা গড়ে উঠতে পারে।
গটিঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক গবেষণা পৃথিবীর কোর থেকে স্বর্ণ ও মূল্যবান ধাতুর আস্তে আস্তে ম্যান্টলের মধ্য দিয়ে উপরের দিকে উঠে আসার প্রমাণ দিয়েছে। এটি পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন ও গতিবিধির উপর দীর্ঘদিনের ধারণাকে বদলে দিয়েছে এবং মূল্যবান ধাতুর উৎস ও বন্টন নিয়ে নতুন গবেষণার সুযোগ তৈরি করেছে। সরাসরি এই ধাতু উত্তোলনের সম্ভাবনা কম হলেও এ আবিষ্কার ভূতত্ত্ব ও ভূ-রসায়নে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।


