আটলান্টিক মহাসাগরের স্রোতব্যবস্থা অ্যাটলান্টিক মেরিডিওনাল ওভারটার্নিং সার্কুলেশন (AMOC) যেকোনো সময় সংকট-সীমায় পৌঁছে গেলে বিশ্বের জলবায়ুর উপর এর প্রভাব হবে মারাত্মক।
আটলান্টিক মহাসাগরের স্রোতব্যবস্থা
AMOC হলো সমুদ্রের পানির বিশাল একটা কনভেয়র বেল্টের মতো, যা Tropics বা উষ্ণমণ্ডলীয় (বিষুবরেখার কাছ থেকে) অঞ্চল থেকে ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার দিকে গরম পানি বয়ে নিয়ে যায় এবং যখন এই গরম পানি গ্রিনল্যান্ড এবং আইসল্যান্ডের কাছাকাছি পৌঁছে তখন আস্তে আস্তে ঠান্ডা হয় আর ভারী হয়ে নিচে নেমে যায়। এই ঠান্ডা ভারী পানি সমুদ্রের তলদেশে পৌঁছে আবার দক্ষিণের উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয় এবং আস্তে আস্তে আবার সমুদ্রের নিচ থেকে উপরে উঠে আসে । উপরে ওঠে আসার পর এই পানি আবার গরম হয়, এবং পুরো স্রোত প্রক্রিয়াটি আবার শুরু হয়। তাপ পরিবহনের কারণে AMOC পৃথিবীর তাপমাত্রার ভারসাম্য রাখতে সাহায্য করে। যদি কোনো কারণে AMOCI স্রোতের শক্তি কমে যায় বা সিস্টেমটি থেমে যায়, সেটার প্রভাব পড়বে পুরো বিশ্বের জলবায়ুর উপর।
সাম্প্রতিক উপাত্ত ও পর্যবেক্ষণ
বিজ্ঞানীরা ২০০৪ সাল থেকে যান্ত্রিকভাবে মাপা ডাটা বিশ্লেষণ করে দেখতে পেয়েছেন যে গত ২০ বছরে AMOC’র শক্তি ১০% হ্রাস পেয়েছে। যদি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ বর্তমান হারে অব্যাহত থাকে, তবে ২১শ শতাব্দীর শেষ নাগাদ AMOC’র শক্তি ৩০%-৫০% হ্রাস পেতে পারে। ফলে ইউরোপে চরম আবহাওয়ার পরিবর্তন, গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরণে পরিবর্তন, দীর্ঘস্থায়ী খরা বা আকস্মিক বন্যার সম্ভাবনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির উচ্চতা বেড়ে যাবে। বড় বিপদ হবে কোনো সামান্যতম জলবায়ু উষ্ণায়নের কারণে AMOC সংকটসীমায় (Tipping Point) পৌঁছে একেবারে দুর্বল বা বন্ধ হয়ে গেলে। প্রশ্ন আসে, এটা কি ঘটতে পারে?
Salt feedback সিস্টেম
একটা তত্ত্ব আছে যে আটলান্টিকের ‘Salt feed- back’ সিস্টেমে পরিবর্তনের কারণে AMOC সংকটসীমায় পৌঁছাতে পারে এবং বন্ধ হয়ে যেতে পারে ও তবে এটি কোনো প্রমাণিত সত্য নয়। সল্ট ফিডব্যাক এর তত্ত্বটা হলো, AMOC আটলান্টিকে লবনাক্ত পানি নিয়ে আসে আর কম লবনাক্ত পানি গভীর সমুদ্রের দিকে পাঠিয়ে দেয়। যদি AMOC দুর্বল হয়ে পড়ে তাহলে আটলান্টিকের সমুদ্র পৃষ্ঠের পানি মিঠা হতে শুরু করবে, যেটার নেতিবাচক একটা প্রভাব পড়বে আটলান্টিকের স্রোতের সিস্টেমের উপর। এই পরিবর্তিত ‘Salt feed- back’ সিস্টেমটি একটি চক্র তৈরি করতে পারে যেটা শেষ পর্যন্ত AMOC-কে সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলতে পারে। কোনো একটা ছোট কারণ, যেমন গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলনের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াটি শুরু হতে পারে। ১৯৬০-এর দশকে গাণিতিক মডেলগুলোও দেখিয়েছিল যে, AMOC একটি সংকটসীমায় পৌঁছে ধসে পড়তে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো, নতুন পরিসংখ্যানগত পদ্ধতি ব্যবহার করে ইঙ্গিত দেয় যে ২০৫০ সালের মধ্যে AMOCর সংকট-সীমায় পৌঁছে ধসের সম্ভাবনা ৪২% – ৭৬% পর্যন্ত হতে পারে। যদিও এই ফলাফলগুলোর ভিত্তি পরোক্ষ তথ্য এবং এখনও পুরোপুরি পর্যালোচনা করা হয়নি, তারপরও বিষয়টা বেশ ভাবার মত ।
বঙ্গোপসাগরে প্রভাব
একটি দুর্বল AMOC দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি বায়ুর সিষ্টেমকে বদলে দিতে পারে যার ফলে অতিরিক্ত বৃষ্টি ও বন্যা বা দীর্ঘ খরার সৃষ্টি হতে পারে, যা খাদ্য উৎপাদন এবং পানির সম্পদের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও AMOC দুর্বল হওয়ার ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি প্রধানত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে ঘটবে, কিন্তু বৈশ্বিক জল পুনর্বণ্টনের ফলে বঙ্গোপসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে ফলে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকাগুলোয় বেড়ে যাবে বন্যার ঝুঁকি ।


