“ছেলে মানুষ কাঁদে না।” “মেয়েলি আচরণ করিস না।” “পুরুষদের দুর্বলতা দেখানো চলবে না।” এই সব কথা যেন আমাদের সমাজে ছেলেদের জন্মসঙ্গী। পরিবার, স্কুল, পাড়া সব জায়গাতেই যেন এক অলিখিত নিয়ম প্রচলিত “পুরুষ হওয়া মানেই আবেগহীন হও।” এই মনোভাব সমাজে এক বিশেষ ধরনের বিষাক্ত মানসিকতার জন্ম দেয়, যাকে মনোবিজ্ঞানে আমরা আজ বলি Toxic Masculinity। এটি শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে প্রোথিত এক মানসিকতা।
একটি শিশুর জন্মের পর থেকেই পরিবার তার উপর নির্দিষ্ট কিছু সামাজিক ভূমিকা আরোপ করে। যদি সে ছেলে হয়, তাকে বলা হয় “সংসারের কর্তা হবে”, “মা-বাবার দায়িত্ব নেবে”, “বোনকে রক্ষা করবে”। কিন্তু সেই দায়িত্বের তালিকায় কখনোই আবেগপ্রকাশ, দুর্বলতা বা সহানুভূতির জায়গা থাকে না। একটি ছেলেশিশু যখন ব্যথায় কাঁদে, তখন তাকে থামিয়ে বলা হয়, “ছেলে হয়ে কাঁদছো?” অথচ একটি মেয়েশিশু কাঁদলে তাকে কোলে নিয়ে আদর করা হয়। এমনকি, বাবা-মা নিজেরাও না বুঝেই এই দ্বৈত মানদণ্ড প্রয়োগ করেন। এটাই হয় “ভদ্র ছেলের” সংজ্ঞা গঠনের প্রথম ধাপ।
ছোটবেলায় একটা ছেলে যদি রান্নাবান্না করতে চায়, পুতুল নিয়ে খেলতে চায় বা বেশি আবেগপ্রবণ হয়, পরিবারে অনেক সময় ঠাট্টার পাত্র হয়ে ওঠে। বলা হয়, “নাকি কাঁদুনে মেয়ে হয়ে গেছিস?” এই ঠাট্টা একরকম Gender Policing, যেখানে পরিবারের ভেতরেই একটি ছেলেকে শেখানো হয় কী করতে পারবে, কী পারবে না। আবার ভাই-বোন একসাথে কান্না করলে, বোনকে সান্ত্বনা দেওয়া হয়, ভাইকে শক্ত হতে বলা হয়। এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো থেকেই ছেলেদের মন থেকে মানবিক অনুভূতি চাপা দেওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়।
বাংলাদেশে অধিকাংশ পরিবারই এখনও কমবেশি পিতৃতান্ত্রিক গঠনের মধ্য দিয়ে চলে। এক্ষেত্রে পরিবারের পুরুষ সদস্য বাবা, কাকা বা দাদা একটি নির্দিষ্ট ‘মডেল’ হিসেবে হাজির হন, যিনি শক্ত, কর্তৃত্বশালী, আবেগহীন ও কখনও কাঁদেন না। এই পুরুষ চিত্রই শিশুর কাছে আদর্শ হয়ে ওঠে। সে ভাবে, “পুরুষ মানেই শাসন করা, সহ্য করা, কিন্তু কখনোই নরম হওয়া নয়।” আর এভাবেই ছেলে সন্তান মনে করে ভালবাসা, ভয়, কান্না, দুঃখ এসব তার জন্য নয়।
শুধু পরিবারই নয়, পাঠ্যপুস্তক এবং গণমাধ্যমও এই বিষাক্ত চিন্তা ছড়িয়ে দেয়। বইয়ে দেখা যায় পুরুষ চরিত্র বীর, ত্যাগী, আবেগবর্জিত। আর নারীরা আবেগপ্রবণ, কাঁদে, সান্ত্বনা দেয়। ফলে শিশু শিখে, “আবেগ মানেই নারীত্ব, আর শক্তি মানেই পুরুষত্ব।” একই ছবি সিনেমা বা নাটকেও দেখা যায় যেখানে পুরুষ নায়ক আবেগ দেখালে তাকে দুর্বল দেখানো হয়। খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা যায়, একজন পুরুষ চরিত্র কান্না করছে, সহানুভূতি দেখাচ্ছে, কিংবা অন্য কাউকে ভালোবাসা প্রকাশ করছে।
এই সমাজিক রীতিনীতি ছেলেদের শিখিয়ে দেয় তাদের অনুভূতি প্রকাশ করা লজ্জার। আর আবেগ জমা হতে হতে একসময় তা বিষণ্নতা, রাগ বা সহিংসতায় রূপ নেয়। বাংলাদেশে পুরুষদের মধ্যে আত্মহত্যার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা থাকলেও তারা কাউকে বলেন না, চিকিৎসা নেন না। কারণ পরিবার তাদের শিখিয়েছে, পুরুষ হলে শক্ত থাকতে হয়, চিকিৎসা নেওয়া মানে দুর্বল হওয়া। এই মানসিকতা থেকেই জন্ম নেয় পারিবারিক সহিংসতা, নারীর প্রতি কর্তৃত্ববাদী মনোভাব এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভাঙন। অধিকাংশ পুরুষ জানে না কীভাবে আবেগ প্রকাশ করতে হয়, সহানুভূতি দেখাতে হয় বা দুঃখ ভাগাভাগি করতে হয়।
শহরেও আধুনিক শিক্ষা ও মিডিয়ার উপস্থিতি থাকলেও পরিবারিক কাঠামো এখনো অনেকটাই রক্ষণশীল। একদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় আবেগ প্রকাশ করাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, অন্যদিকে বাড়িতে বলা হয়, পুরুষ হয়ে এগুলো করছো? গ্রামে আবার পরিবার অনেক সময় ছেলেদের একপ্রকার যোদ্ধা হিসেবে গড়ে তোলে। ছোট থেকেই মাঠে কাজ, পরিবারের দায়িত্ব এবং নারীর উপর কর্তৃত্ব সব শেখানো হয়। ফলে আবেগপ্রকাশ সেখানে আরও নিষিদ্ধ হয়ে যায়।
Toxic Masculinity বন্ধ করতে হলে পরিবারকেই প্রথম পদক্ষেপ নিতে হবে। বাবা-মায়েরা যদি ছেলেদের কাঁদতে, ভয় পেতে, ভালোবাসতে ও দুঃখ প্রকাশ করতে দেয়, তাহলে সমাজে নতুন ধরণের পুরুষ গড়ে উঠবে। তারা হবে সাহসী কিন্তু সহানুভূতিশীল, নেতৃত্বশীল কিন্তু শ্রদ্ধাশীল। পরিবারে শোনা উচিত “তুমি ছেলে বলে কাঁদতে পারবে না” এর পরিবর্তে “তুমি মানুষ, তাই কাঁদা, হাসা, ভালোবাসা সবই তোমার অধিকার।”
বাংলাদেশি পরিবারে Toxic Masculinity শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গঠনের প্রতিফলন। কিন্তু পরিবর্তনের বীজও এখানেই লুকিয়ে আছে। যদি পরিবার নিজের রীতিগুলো বদলাতে শুরু করে, তবে একদিন সমাজও নতুন চোখে আবেগবান, সহানুভূতিশীল পুরুষের স্বীকৃতি দিতে শিখবে। শিখবে আবেগ দেখানো দুর্বলতা নয় বরং সেটাই মানবিকতা।


