মিশরের গিজা মালভূমিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সুবিশাল পিরামিডগুলো পৃথিবীর প্রাচীন সপ্তাশ্চর্যের মধ্যে আজও অন্যতম। প্রায় ৪,৫০০ বছর আগে মিশরীয়দের পুরাতন রাজত্বকালে নির্মিত এই স্মৃতিস্তম্ভগুলি কেবল ফারাওদের সমাধিক্ষেত্র ছিল না, ছিল প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা, প্রকৌশল এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার এক অনবদ্য প্রতীক। ফারাওরা বিশ্বাস করতেন মৃত্যুর পর তারা দেবত্ব লাভ করবেন, আর তাই পরবর্তী জগতে নিজেদের প্রয়োজনীয় সমস্ত জিনিসপত্রসহ তাদের মরদেহ সংরক্ষণের জন্য এই বিশাল পিরামিড সমাধিগুলি তৈরি করা হয়েছিল। প্রতিটি পিরামিড গিজা পিরামিড কমপ্লেক্সের একটি অংশ, যার মধ্যে প্রাসাদ, মন্দির, সোলার বোট পিট এবং অন্যান্য কাঠামোও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তবে যে প্রশ্নটি আজও ইতিহাসবিদ ও প্রকৌশলীদের কৌতূহলী করে তোলে, তা হলো— ঠিক কীভাবে এই বিশাল স্থাপত্যগুলি নির্মাণ করা হয়েছিল?
পিরামিড নির্মাণের ধারণাটি রাতারাতি আসেনি। খ্রিস্টপূর্ব ২৭৮০ সালের আগে ফারাওদের বেঞ্চ-আকৃতির সমাধি দেওয়া হতো। এরপর স্থপতি ইমহোটেপ ফারাও জোসেরের জন্য একটির ওপর আরেকটি ছয়টি ফ্ল্যাট-ছাদযুক্ত মাস্তাবা স্তূপ করে স্টেপ পিরামিড তৈরি করেন।
এই ধারণাকে পরবর্তী স্তরে নিয়ে যান চতুর্থ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ফারাও স্নেফ্রু । তিনি মেইদুম-এ একটি স্টেপ পিরামিড তৈরি করে তার ধাপগুলি ভরাট করে এটিকে মসৃণ পিরামিডের রূপ দেন। এরপর ডাহশুরে তিনি এমন একটি পিরামিড নির্মাণের চেষ্টা করেন যার চারটি ত্রিকোণাকার দেয়াল কেন্দ্রে মিলিত হবে। তবে নির্মাণ চলাকালীন সেটি এলোমেলো হয়ে পড়লে এর কৌণিকতা পরিবর্তন করা হয়, ফলে এটি ‘বেন্ট পিরামিড’ নামে পরিচিত। স্নেফ্রু তার তৃতীয় পিরামিড ‘রেড পিরামিড’ নির্মাণ করেন তুলনামূলক নিচু ৪৩ ডিগ্রি কোণে, যা ছিল একটি সফল ও স্থায়িত্বপূর্ণ কাঠামো।
প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, স্নেফ্রুর এই কঠিন অভিজ্ঞতা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফসলই কাজে লাগিয়েছিলেন তাঁর পুত্র খুফু, যিনি গিজার মহা পিরামিডের স্থপতি। প্রত্নতাত্ত্বিক মার্ক লেহনারের ভাষায়, “স্নেফ্রু যেন সমস্ত গবেষণা ও উন্নয়ন এর কাজটি সেরে রেখেছিলেন।”
গিজার তিনটি প্রধান পিরামিড চতুর্থ রাজবংশের তিন ফারাও দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। খুফুর মহা পিরামিড আনুমানিক ২৫৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ফারাও খুফু নির্মাণ শুরু করেন। এটি গিজার পিরামিডগুলির মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ, যা মূলত প্রায় ৪৬৯ ফুট (১৪৭ মিটার) উঁচু ছিল। অনুমান করা হয়, এতে প্রায় ২.৩ মিলিয়ন পাথরের ব্লক ব্যবহার করা হয়েছিল, যার প্রতিটির গড় ওজন ২.৫ থেকে ১৫ টন। এর মসৃণ আবরণ পাথরগুলি এখন আর নেই, তবে এর বিশালতা আজও বিস্ময়কর।
খুফুর পুত্র ফারাও খাফ্রে আনুমানিক ২৫২০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে দ্বিতীয় খাফ্রের পিরামিডটি নির্মাণ করেন। এই কমপ্লেক্সের একটি স্বতন্ত্র অংশ হলো বিশাল চুনাপাথরের মূর্তি গ্রেট স্ফিংস, যার দেহ সিংহের এবং মাথা ফারাওয়ের। স্ফিংস হয়তো ফারাওয়ের সমাধি কমপ্লেক্সের প্রহরী হিসেবে দাঁড়ানো।
খাফ্রের পুত্র মেনকাউরে আনুমানিক ২৪৯০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তৃতীয় পিরামিডটি তৈরি করেন, যা প্রথম দুটি পিরামিডের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট। এই কমপ্লেক্সে মেনকাউরের নিজস্ব চেম্বার ছাড়াও তিনটি পৃথক রানির পিরামিড অন্তর্ভুক্ত ছিল।
গিজার পিরামিডগুলি কীভাবে তৈরি হয়েছিল, তা আজও একটি বিতর্কের বিষয়। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলি এই নির্মাণ প্রক্রিয়ার ওপর যথেষ্ট আলোকপাত করেছে।
পিরামিড নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় বিশাল আকারের পাথরগুলি দূর-দূরান্ত থেকে আনা হয়েছিল। আসোয়ান থেকে গ্রানাইট, সিনাই উপদ্বীপ থেকে তামা কাটার সরঞ্জাম এবং লেবানন থেকে কাঠ নৌকায় করে নীল নদ এবং কৃত্রিম খালগুলির একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গিজা মালভূমিতে নিয়ে আসা হয়েছিল। কর্মীদের খাদ্যের জন্য নীল নদের ব-দ্বীপের কাছাকাছি খামার থেকে গবাদি পশুকেও সরবরাহ করা হতো। প্রত্নতাত্ত্বিকরা মনে করেন, এই বিশাল সরবরাহ ব্যবস্থা ফারাওদের সম্পদ ও নিয়ন্ত্রণের প্রদর্শন হিসেবে এক প্রকার জাতীয় প্রকল্পে পরিণত হয়েছিল।
এত বিশাল আকারের পাথর ব্লকগুলিকে এত উঁচুতে তোলার পদ্ধতিটি নিয়েই সবচেয়ে বেশি বিতর্ক। সাধারণ বিশ্বাস অনুযায়ী, মিশরীয়রা সম্ভবত বড় র্যাম্প তৈরি করে তার ওপর দিয়ে স্লেজ, দড়ি, রোলার এবং লিভার ব্যবহার করে পাথরগুলি টেনে নিয়ে যেত। কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন, এই র্যাম্পগুলি পিরামিডের বাইরের দিকে জিগ-জ্যাগ বা সর্পিল আকারে তৈরি হয়েছিল।
একটি বিতর্কিত তত্ত্ব অনুযায়ী, পিরামিডের অভ্যন্তরে র্যাম্প ব্যবহার করা হয়েছিল। ভবিষ্যতের উন্নত ইমেজিং প্রযুক্তি হয়তো এই রহস্যের সমাধান করতে পারে। সম্প্রতি স্ক্যানপিরামিডস প্রকল্পের মাধ্যমে পিরামিডের অভ্যন্তরে গ্র্যান্ড গ্যালারির আকারের সমতুল্য একটি ফাঁকা স্থান এবং ‘নর্থ ফেস করিডোর’ আবিষ্কৃত হয়েছে, যা নির্মাণকাজে ব্যবহৃত কোনো কাঠামো হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করা হতো, পিরামিডগুলি দাসদের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। তবে গিজার ‘লস্ট সিটি অফ দ্য পিরামিডস’-এ প্রত্নতাত্ত্বিক মার্ক লেহনারের গবেষণা থেকে জানা যায়, এখানে শ্রমিকদের একটি সংগঠিত বসতি ছিল। এই শহরে দীর্ঘ ব্যারাক, প্রশস্ত রাস্তা, কারিগরদের সম্প্রদায় এবং সরবরাহকারী অবকাঠামো ছিল। প্রমাণ থেকে জানা যায়, শ্রমিকরা প্রচুর পরিমাণে রুটি, বিয়ার এবং ভালো মানের মাংস খেত, সেইসাথে তারা উন্নত চিকিৎসা সুবিধাও পেত। এর থেকে প্রমাণিত হয় যে শ্রমিকদের যথেষ্ট মূল্যবান মনে করা হতো এবং তারা স্বেচ্ছায় বা আবর্তিত শ্রমিক হিসেবে এই জাতীয় নির্মাণযজ্ঞে অংশ নিত।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য যে অবকাঠামো ও সাংগঠনিক দক্ষতার প্রয়োজন হয়েছিল, তা আসলে প্রাচীন মিশরকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে শক্তিশালী করতে সাহায্য করেছিল। লেহনারের মতে, “পিরামিড নির্মাণকে সমর্থন করার জন্য যে অবকাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা একসময় বিশাল পিরামিড নির্মাণের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আসল অগ্রগতি ছিল মানুষকে সংগঠিত করার মধ্যে।”
গিজার পিরামিডগুলি কেবল ফারাওদের সমাধি নয়, বরং প্রাচীন মিশরীয়দের সূক্ষ্ম জ্যামিতিক জ্ঞান, প্রকৌশল দক্ষতা এবং বিশাল জনবলকে সংগঠিত করার অবিশ্বাস্য ক্ষমতার এক জ্বলন্ত প্রমাণ। পিরামিডগুলি কম্পাসের দিকগুলির সঙ্গে অবিশ্বাস্য নির্ভুলতার সাথে সারিবদ্ধ ছিল। ফারাওরা হয়তো তারকা ব্যবহার করে বা নির্দিষ্ট তারিখে ছায়া মানচিত্র তৈরি করে এই কাজ করেছিলেন। গ্রীষ্মকালে সূর্যকে গ্রেট স্ফিংস থেকে দেখলে তা খুফু ও খাফ্রের পিরামিডের ঠিক মাঝখান দিয়ে অস্ত যায়।
পিরামিডের অভ্যন্তরে আবিষ্কৃত চিত্র ও শিলালিপিগুলি প্রাচীন মিশরীয়দের জীবনযাত্রা, কৃষি, শিকার, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং ভাষার ওপর অমূল্য তথ্য সরবরাহ করেছে। স্ক্যানপিরামিডস প্রকল্পের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আজও পিরামিডের অভ্যন্তরের নতুন নতুন শূন্যস্থান আবিষ্কৃত হচ্ছে, যা তাদের নির্মাণ পদ্ধতি সম্পর্কে আরও নতুন প্রশ্ন ও তথ্যের জন্ম দিচ্ছে। গিজার পিরামিডগুলি তাদের অনন্তকাল ধরে টিকে থাকার লক্ষ্য অর্জন করেছে এবং ভবিষ্যতেও তাদের নির্মাণ-রহস্যের উন্মোচন ইতিহাসের এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।


