পিথাগোরাস নামটি আমাদের চেনা, স্কুলজীবনে তার বিখ্যাত উপপাদ্য হয়তো অনেকেরই মনে গেঁথে আছে, আবার অনেকের জন্য এখনো দুঃস্বপ্ন হয়ে আছে। একটি সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজের উপর অঙ্কিত বর্গক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল ঐ ত্রিভুজের অপর দুই বাহুর উপর অঙ্কিত বর্গক্ষেত্রদ্বয়ের ক্ষেত্রফলের সমষ্টির সমান । কিন্তু এই উপপাদ্য কি আদৌ পিথাগোরাসের মৌলিক আবিষ্কার? সম্প্রতি একাধিক প্রাচীন ব্যাবিলনীয় কাঁদামাটির ফলক বিশ্লেষণ করে গবেষকরা প্রমাণ পেয়েছেন, প্রাচীন ব্যাবিলনীয় গণিতবিদরা এই সূত্র জানতেন পিথাগোরাসের জন্মের বহু আগেই। প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ১৭৭০ সালের দিকে, অর্থাৎ তার জন্মের কমপক্ষে ১,০০০ বছর আগে।
এই আবিষ্কার কেবল গণিতের ইতিহাসকেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে না, বরং প্রাচীন সভ্যতাগুলোর বিজ্ঞান ও জ্ঞানচর্চার ধারাও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এই আবিষ্কারের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো একটি কাঁদামাটির ফলক, যেটিকে আধুনিক গবেষকরা নাম দিয়েছেন “Plimpton 322”। এটি বর্তমানে নিউ ইয়র্কের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত রয়েছে। ফলকটি প্রায় ৮.৮ ইঞ্চি লম্বা ও ৪ ইঞ্চি চওড়া এবং এতে রয়েছে চারটি কলামে সাজানো ১৫টি সারি— যেখানে কিছু সংখ্যার তালিকা দেওয়া আছে। এই সংখ্যাগুলো শুধু এলোমেলো হিসাব নয়। গবেষকরা লক্ষ করেছেন, প্রতিটি সংখ্যা আসলে একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক সম্পর্ক প্রকাশ করছে, যেটা আমরা আজ চিনি “পিথাগোরাসীয় ত্রয়ী” (Pythagorean triples) নামে— যেমন: 3,4,53,4,5 অথবা 5,12,135,12,13। এই তিনটি সংখ্যা দিয়ে এক সমকোণী ত্রিভুজ গঠন করা সম্ভব যেখানে উপপাদ্যটি প্রযোজ্য।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, Plimpton 322 সম্ভবত একটি গাণিতিক টেবিল বা রেফারেন্স চার্ট, যা তৎকালীন ব্যাবিলনীয় গণিতবিদেরা জ্যামিতিক হিসাব-নিকাশে ব্যবহার করতেন। ব্যাবিলনীয় গণনা আধুনিক দশমিক পদ্ধতির মতো ছিল না। তারা ব্যবহার করত sexagesimal, অর্থাৎ বেস-৬০ সংখ্যা পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে তারা ৬০ সংখ্যাটিকে ভিত্তি ধরে সব গণনা করত। ফলে তাদের গণনায় ভগ্নাংশ প্রকাশ করা অনেক নমনীয় এবং সূক্ষ্মভাবে সম্ভব ছিল, যা বর্গমূল জাতীয় জটিল সংখ্যাগুলো নির্ণয়ে সহায়ক ছিল।
এমনকি একটি ভিন্ন ফলকে পাওয়া গেছে √2 এর একটি সূক্ষ্ম মান: 2≈1.41421296 , 2≈1.41421296 , যা আশ্চর্যজনকভাবে আধুনিক গণনায় গ্রহণযোগ্য মানের খুব কাছাকাছি। এতে বোঝা যায়, প্রাচীন ব্যাবিলনীয়রা কেবল ত্রিভুজের জ্যামিতি নয়, অমূলদ সংখ্যার ধারণাও রপ্ত করেছিল। তাহলে এই ম্যাথ পাজল পিথাগোরাসের নামেই কেন? প্রশ্নটি খুব স্বাভাবিক, যখন ব্যাবিলনের গণিতবিদরা হাজার বছর আগে থেকে সূত্রটি জানতেন, তখন কেন একে “পিথাগোরাসের উপপাদ্য” বলা হয়?
এর পেছনে রয়েছে ইতিহাসের এক দার্শনিক প্রবণতা। পিথাগোরাস (খ্রিস্টপূর্ব ৫৭০–৪৯৫) ছিলেন একজন গ্রিক দার্শনিক ও গণিতবিদ যিনি “Pythagorean Brotherhood” নামে এক গোপনীয় জ্ঞানসম্প্রসারণ কেন্দ্র গড়ে তোলেন। এই সংগঠনটি সংগঠিতভাবে জ্যামিতিক জ্ঞান চর্চা ও প্রচারে নিরলস কাজ করেছে। পিথাগোরাসের নিজস্ব কোনো লিখিত রচনা টিকে না থাকলেও তার অনুসারীদের মাধ্যমেই এই সূত্র গ্রিসে জনপ্রিয়তা পায়। গ্রিক দার্শনিক প্লেটো এবং ইউক্লিড পরবর্তীকালে এই সূত্রকে গাণিতিক কাঠামোর ভিত হিসেবে গ্রহণ করেন এবং ইউরোপীয় জ্ঞানবিশ্বে এটি “Pythagorean Theorem” হিসেবে চিহ্নিত হয়। পিথাগোরাস সূত্রটি প্রথম আবিষ্কার না করলেও,তার সাংগঠনিক কাঠামো এবং গোপন বিদ্যালয়ের মাধ্যমে তিনি একে সাংস্কৃতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
বিষয়টি আমাদের ভাবিয়ে তোলে, কতো জ্ঞানই না সময়ের গহ্বরে হারিয়ে গেছে কেবলমাত্র সংরক্ষণ ও প্রচারের অভাবে। ব্যাবিলনের মতো সভ্যতা, যাদের মেধা ও গণিতচর্চা সময়ের চেয়েও অগ্রগামী ছিল, তাদের অবদান দীর্ঘদিন অবহেলিত থেকেছে কেবল পশ্চিমা প্রাধান্যের কারণে। Plimpton 322 নিয়ে বিশ্লেষণ করা ইতিহাসবিদ Eleanor Robson বলেন, এই ফলকটি শুধুমাত্র গণিত নয়, বরং ব্যাবিলনের শিক্ষা পদ্ধতি, প্রশাসনিক কাজ, এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানেও গণিতের প্রয়োগের ইঙ্গিত দেয়। আজ হয়তো আমরা পিথাগোরাসের নাম জানি, কিন্তু যিনি ৩,৫,৪ ত্রয়ী কাদামাটির উপর প্রথম হাতে লিখেছিলেন তার নাম আমরা জানি না। অথচ তার সেই ক্ষুদ্র ফলক আমাদের গণিতচর্চার একটি নতুন ইতিহাস জানান দিচ্ছে।
এই ইতিহাস আমাদের শেখায় সভ্যতা এককেন্দ্রিক নয়, জ্ঞানও নয়। পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে মানুষ চিন্তা করেছে, নিরীক্ষা করেছে, আবিষ্কার করেছে। এবং কখনো কখনো সময়ের স্তূপের ভেতর থেকে সেই হারিয়ে যাওয়া চিন্তাই আবার ফিরে আসে। জ্ঞান হারায় না, হারিয়ে যাওয়া নামের নিচে চাপা পড়ে। Plimpton 322 যেন তার নিঃশব্দ প্রমাণ।


