গুহাবাসীরা এঁকেছিল শরীর
দেবতারা খুঁজল পাথর …
কোনো অভিব্যক্তির শৈল্পিক সৌন্দর্যকে শিল্প বলা যায়। শৈল্পিক সৌন্দর্য উপস্থাপনে শিল্পী যেভাবে অন্তরের মূর্ছনায় কায়া-কান্তময় করে তুলতে পারেন, তাঁর শিল্পপ্রয়াসের অনুভূতি ও অনুতৃপ্তি ততটুকুই সসীম ও পরিব্যাপ্ত হয়ে উঠবে। আসলে উপস্থাপন নির্ভর করে শিল্পীর চৈতন্যবোধ, যাপিত জগৎ ও শিল্পকৌশলের বিনির্মাণ-সমগ্রতার ওপর। এ-কারণে অনেকে শিল্পকে জীবন ও জগতের প্রতিরূপ বলতে চেয়েছেন। তবে ললিতকলা বা চারুশিল্পের ভাষায় শিল্প হলো সৃজন বা সৃষ্টিশীল।
পাবলো রুইজ ই পিকাসো ১৮৮১ সালের ২৫ অক্টোবর স্পেনের মালাগা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। পিকাসোর বাবার নাম হোসে রুইজ ব্লাসকো এবং মায়ের নাম মারিয়া পিকাসো লোপেজ। পাবলো মায়ের নামাঙ্কিত ‘পিকাসো’কে সারাবিশ্বে আলোর মূর্ছনায় ছড়িয়ে দিয়েছেন। পাবলো পিকাসো মাত্র দশ বছর বয়সে শিল্পকর্মের জন্য খ্যাতি অর্জন করেন! ওই বয়সেই স্প্যানিশ ফ্রান্সিসকো ডি জোয়ারবেরন, ফ্রান্সিসকো গয়া, জকুইন সঁরল্লা, জোয়ান গ্রিস, জোয়ান মিরো, সালভাদর দালির মতো খ্যাতিমান শিল্পীর নামের পাশে তাঁর নাম স্থান করে নেয় এবং সুনাম অর্জন করে। তাঁর মতো এত অল্প বয়সে সে-সময় ইউরোপে শিল্পকর্মের জন্য বিখ্যাত হওয়ার দৃষ্টান্ত অতিনগণ্য।
মাত্র ১৬ বছর বয়সে বার্সেলোনা শহরে তাঁর চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়। তবে পাবলো পিকাসোর চিত্রকর্ম শুরু থেকে মধ্যযুগীয় চার্চের চিন্তাজগৎ ও ধর্মানুরাগের বাইরে বেশ ভালো করেই মুক্তচিন্তার আবহে প্রস্ফুটিত ও সম্ভারিত হয়। তাঁর চিত্রকর্ম গির্জা-অনুরাগ ও দেবদেবীর সদৃশমণ্ডিত পিউরিটান কল্পজগৎকে অতিক্রম করে মানবতাবাদ বা humanism-এর দৃকপাত অর্জনে সমর্থ হয়। প্রসঙ্গক্রমে এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ইউরোপে মধ্যযুগীয় চিন্তাচেতনা থেকে বেরিয়ে আসার আন্দোলন শুরু হয় মূলত ষোড়শ শতাব্দীতে। এ-সময় থেকে মানুষ তার ভাবনায় গেঁথে ফেলে – ‘প্রতিভা কোনো দৈবলব্ধ দান নয়।’ এই পরিবর্তনকে ইউরোপীয় রেনেসাঁস বলা হয়। ইউরোপীয় এই রেনেসাঁসে Sir Thomas More-এর ‘Utopia’ এবং Bacon-এর ‘Novum Organum’-এর প্রভাবের কথা উল্লেখ করা যায়।
ষোড়শ শতাব্দীতে শুরু হওয়া রেনেসাঁস আন্দোলনের ঢেউ পুরো ইউরোপের শিল্প, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বোধে আমূল পরিবর্তন এনে দেয়। এ সময় বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধিত হয়। বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে মানুষ গ্রামোফোন, টেলিফোন, বেতার, চলচ্চিত্র, বাইসাইকেল, মোটরগাড়ি, অ্যারোপ্লেন ইত্যাদি লাভ করে। অন্যদিকে সমাজতন্ত্র ও মানবতাবাদের আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। মানুষের রাজনৈতিক চিন্তায় পরিবর্তন সাধিত হয়।পাবলো পিকাসো ছিলেন মূলত একজন সচেতন ও পরিবর্তিত সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে থাকা পরিবারের সন্তান। তাঁর শিল্পকর্মের আভিজাত্যের অভিব্যক্তিতে খুব অল্প সময়ে ইমপ্রেশনিজম ও এক্সপ্রেশনিজমের কালোত্তীর্ণ কৌশলগুলো সহজে ধরা দেয়। তিনি শিল্পকর্মের চিন্তাধারায় নিজের অভিব্যক্তিকে চলমান ব্যঞ্জনার সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করে ‘চিত্রকর্মের নিজস্ব জীবন’ প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়েছিলেন।
১৯০৪ সালে স্পেনের মালাগা ছেড়ে প্যারিসে আগমন ছিল তাঁর জীবনে শিল্পজগতের গৌরব বহনের মাইলফলক। এখানে বলে রাখা ভালো, তিনি শিল্প-সাহিত্যের ‘মিউজিয়াম’খ্যাত প্যারিসে স্থায়ী হওয়ার আগেই ইমপ্রেশনিস্ট পদ্ধতি আয়ত্ত করেন এবং বিখ্যাত তুলুস লুৎরেকের শিল্পভঙ্গির সঙ্গে এক্সপ্রেশনিস্ট শিল্পভঙ্গির মিশ্রণ ঘটাতে সমর্থ হন। তিনি শিল্পভঙ্গি ও ইল্যুশনের মাত্রায় ১৯০৭ সালে কিউবিজমের উদ্ভাবন ঘটান। পিকাসো কঙ্গো ও আইভরি কোস্টের নিগ্রোদের মুখোশ, হিংস্রতা, বীভৎসতা, আদিমতা ও বন্যতায় কিউবিজমের ব্যবহারে ‘barbaric sense’-এর ধারণায় এক নতুন মাত্রা প্রতিষ্ঠা করেন। আদিমতা ও বন্যতা মানবেতিহাসের পরাবাস্তবতাকে প্রমাণ করে। এ-আদিমতার আকর্ষণকে শিল্পী যেমন তাঁর শিল্পসৌকর্য-সৌষ্ঠবের আঁচড়ে নন্দিত ও গৌরবান্বিত করেছেন, তেমনি সংগীত ও কাব্যে মূর্ছনা ও নির্মিতির বহুমাত্রিকতা আমরা লক্ষ করি। এ-আদিম সজীবতার ধ্যানে মানুষ বিপর্যস্ত ও কাঙ্ক্ষার অনলে যন্ত্রণাদগ্ধ হয়েছে আবার পুলকিত হয়েছে – তার বর্ণাঢ্যতা আমরা দেখতে পাই টি.এস এলিয়টের কাব্যে ও রুশোর শিল্পকর্মে। তবে শিল্পবিন্যাসে আদিমতার এক্সপ্রেশনে যে-সত্তার উপস্থিতি শিল্পরসিক ও দর্শক-বীক্ষক উপলব্ধি করেন, তার পার্থক্যটি দৃষ্টির বৈভবের মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয়। সে-কারণে এক্সপ্রেশনের বৈশিষ্ট্যে ‘ভার্টিক্যালে’র একটা প্রশ্ন থাকে। পিকাসো বন্যজীবনে আদিমতার নিরীক্ষায় ঐতিহাসিক সংগতশক্তির আশ্রয় নিয়েছিলেন, স্থৈর্যহীন রং ও রেখার প্রাবল্য এড়িয়ে। ফলে তাঁর চিত্রের ক্যানভাস একটি সৌষম্য ও সিনথেসিস বার্তা এনে দেয়। আবার তাঁর চিত্রে আদিমতার ভয়ংকর রূপের বিবেচনা আগ্রহ ও অপ্রয়োজনীয় প্রমাণ হয়ে পড়ে। ফলে আদিমতা নন্দনতত্ত্বের ঐশ্বর্য অর্জন করে ফভবাদকে (Fauvism) অতিক্রম করে। আর এখানেই মাতিস থেকে পিকাসো ভিন্ন।
গোয়ের্নিকা শিল্পকলার মধ্যযুগীয় গির্জা সিসটিন মিমেসিস ও রেনেসাঁসের ‘পরিপ্রেক্ষিত নাটকীয়তা’ ভাঙার একটি নবনির্মিতির ‘কনটেম্পরার’।গোয়ের্নিকার শক্তি মানবতার এমন এক বিবর্তন, যা হাজার বছরের শিল্পকীর্তির ‘প্রিমি লুমি’কে অতিক্রমণের বিস্ময়কর প্রমাণ বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরে। এ-শিল্পকর্মটি যুদ্ধের বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত প্রতিবাদ, বিরুদ্ধতা ও বিক্ষোভের অধিধ্যান ও প্রতিমূর্তিকে প্রকাশ করে। গোয়ের্নিকার পিকাসো ও পিকাসোর গোয়ের্নিকায় রয়েছে যুদ্ধ ও অশান্তির বিরুদ্ধে ‘বলীবর্দের হুংকার’ ও অনুস্মারক।
গোয়ের্নিকা স্পেনের একটি শহর। ১৯৩৭ সালে স্পেনে গৃহযুদ্ধ চলছিল। ২৬ এপ্রিল জার্মানির নাৎসির সহযোগিতা ও গৃহযুদ্ধ গোয়ের্নিকা শহরটিকে ধ্বংস করে দেয়। নির্মম বোমার আক্রমণে শত শত মানুষ ও প্রাণী নিহত হয়। পিকাসো এ-যুদ্ধের পৈশাচিকতা ও নৃশংসতায় ক্ষুব্ধ ও বেদনার্ত হয়ে সেটি গোয়ের্নিকায় রূপ দিতে অনুপ্রাণিত হন। গোয়ের্নিকার ধ্বংসস্তূপ থেকে দুঃখ ও যন্ত্রণার বোহেমিয়ান, কালো ও ধূসর রঙে উঠে আসে। পিকাসোর ১৩৭.৪ বাই ৩০৫.৫ ইঞ্চি আকারের এ-চিত্রকর্মটি বিশ্ববাসীর কাছে শুধু যুদ্ধ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদই নয়, চিত্রকর্মটি যুগে যুগে মানুষকে ‘যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই’ – বাক্যটিকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
তবে পিকাসোর বিশ্বখ্যাত ‘গোয়ের্নিকা’ দিয়ে তাঁর চিন্তাচেতনার পরিব্যাপ্তি ও সমগ্রতাকে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। একটি ধ্বংস ও প্রতিবাদচিত্র তাঁকে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি এনে দিলেও তাঁর ‘লেই দেমোয়াজেল দে’তিনিয়োঁ’, ‘দ্য উইপিং উইম্যান’, ‘দ্য ব্লু রুম’, ‘ওল্ড গিটারিস্ট’, ‘ল্য মুঁল্যা দ্য লা গালেৎ’, ‘টু নুডস’, ‘সেল্ফ-পোর্ট্রেট’, ‘মডেল অ্যান্ড ফিশবৌল’, ‘থ্রি মিউজিশিয়ানস্’ ও ‘উইমেন অব আলজিয়ার্স’ – নামোল্লিখিত শিল্পকর্মগুলো তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে।


