বিশ্বজুড়ে পানির সংকট আর ভবিষ্যতের পূর্বাভাস নয়, এটি বর্তমান বাস্তবতা। জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বিস্ফোরণ, কৃষি ও শিল্পে জলনির্ভরতা এবং মিঠা পানির উৎসের সীমাবদ্ধতা সব মিলে জল সংকটকে একটি গভীর নীতিনির্ধারক চ্যালেঞ্জে পরিণত করেছে। এ অবস্থায় ‘লবণমুক্তকরণ’ প্রযুক্তি যেমন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে, তেমনি প্রশ্ন উঠেছে এই বিপুল জ্বালানিভিত্তিক প্রযুক্তি কতটা পরিবেশবান্ধব ও দীর্ঘস্থায়ী? এবং সেখানেই উঠে আসে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার।
পারমাণবিক লবণমুক্তকরণ বা nuclear desalination মূলত দুটি সমান্তরাল সংকটকে একযোগে মোকাবিলার একটি কৌশলগত প্রচেষ্টা। একদিকে মিঠা পানির ঘাটতি, অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারণে তৈরি হওয়া জলবায়ু বিপর্যয়। লবণমুক্তকরণ নিজেই একটি উচ্চ-শক্তি নির্ভর প্রক্রিয়া। প্রচলিতভাবে এটি কয়লা বা গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে চলে, যার ফলে এই প্রযুক্তি জল তো দেয়, কিন্তু বাতাসে যুক্ত করে বিপুল কার্বন।
এখানেই পারমাণবিক শক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয় একটি বিকল্প শক্তি উৎস হিসেবে, যা কম কার্বন নির্গমন করে এবং দীর্ঘমেয়াদে নিরবচ্ছিন্নভাবে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তাপ বা বিদ্যুৎ সরবরাহে সক্ষম।
এই যৌথতা কেবল প্রযুক্তিগত নয়, বরং অর্থনৈতিক ও কৌশলগত। বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল উপকূলবর্তী দেশ, যাদের প্রাকৃতিকভাবে মিঠা পানির ঘাটতি রয়েছে, কিন্তু সমুদ্র রয়েছে পাশে—তাদের জন্য এটি একটি জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
ভারতের Kalpakkam Nuclear Desalination Plant এর কথা বলা যায়, যেখানে ভারতের পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রের সহায়তায় পারমাণবিক চুল্লির বর্জ্য তাপ দিয়ে প্রতিদিন ৬০ লক্ষ লিটার পানি লবণমুক্ত করা হচ্ছে। এটি কোনো নিছক কারিগরি অর্জন নয় বরং এটি দেখিয়ে দেয় কিভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরবর্তী স্তরে পারমাণবিক প্রযুক্তি আরও মানবিক প্রয়োজনে ব্যবহৃত হতে পারে।
তবে এই প্রযুক্তির গ্রহণযোগ্যতা শুধু দক্ষতা বা সক্ষমতার উপর নয়, নির্ভর করছে নিরাপত্তা, ব্যয়ের যৌক্তিকতা এবং জনগণের মানসিক প্রস্তুতির উপর। পারমাণবিক শক্তি দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত, এটি পরিবেশবান্ধব হলেও, বিপর্যয়ের সম্ভাবনা বহন করে। কাজেই যখন এটি পানির মতো একটি মানবিক চাহিদার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন এর নিরাপত্তা প্রশ্ন হয়ে ওঠে আরও জরুরিভাবে। এখানে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (IAEA) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাদের ‘DEEP’ সফটওয়্যার এবং নীতিমালা সহায়তার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ এখন অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে নির্ধারণ করতে পারছে কোন রকম পারমাণবিক লবণমুক্তকরণ ব্যবস্থা তাদের জন্য উপযুক্ত।


