• এশিয়া মহাদেশের অন্যতম দীর্ঘ সিন্ধু নদের উৎপত্তি তিব্বতে। সেখান থেকে প্রবাহিত হয়ে জম্মু ও কাশ্মীর দিয়ে পাকিস্তানে ঢুকেছে এই সিন্ধু নদ। সিন্ধু পানি চুক্তি অনুসারে, সিন্ধু অববাহিকার পূর্বাঞ্চলীয় তিনটি নদী—রাভি (ইরাবতী), বিয়াস (বিপাশা) ও সাটলেজ (শতদ্রু০র পানি বরাদ্দ ছিল ভারতের জন্য। আর পশ্চিমাঞ্চলীয় তিনটি নদী—সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাবের পানি ব্যবহারের অধিকার ছিল পাকিস্তানের। ভারত পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর পানি জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সীমিত সেচের জন্য ব্যবহার করতে পারবে। তবে এগুলোর প্রবাহ সংরক্ষণ বা পরিবর্তন করে নিম্নগামী এলাকায় পানি সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারবে না।
• অতীতেও এই চুক্তি নিয়ে বিবাদ তৈরি হয়েছে দুদেশের মধ্যে। ভারতের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং পানি অবকাঠামো নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে পাকিস্তান। অভিযোগ করেছে, চুক্তি লঙ্ঘন করে এসব নদীর প্রবাহ কমিয়ে দিচ্ছে ভারত। অন্যদিকে ভারত দীর্ঘদিন ধরেই সেচ, সুপেয় পানি ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনের কথা বলে, বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বাস্তবতার আলোকে, চুক্তি পর্যালোচনা এবং পরিবর্তনের জন্য চাপ দিয়ে আসছে।
• উজানের দেশ হওয়ায় ভৌগোলিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে ভারত। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষাকালে পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলো যখন ফুলেফেঁপে ওঠে, তখন সেগুলোর কোটি কোটি ঘনমিটার পানির আটকে দেওয়া ভারতের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। এ কাজের জন্য প্রয়োজন পানি সরিয়ে মজুত করে রাখার বিশাল অবকাঠামো আর অগণিত খাল—যা ভারতের নেই। পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাবে ভারত এখনও চুক্তি অনুযায়ী ঝিলম, চেনাব ও সিন্ধু থেকে তার জন্য বরাদ্দ করা ২০ শতাংশ পানিও যথাযথ কাজে লাগাতে পারছে না। তবে জটিল ভূপ্রকৃতি আর ভারতের অভ্যন্তরেই প্রতিবাদের কারণে সিন্ধু অববাহিকায় কিছু পানি অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প খুব একটা দ্রুত এগোয়নি।
• বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুক্তি স্থগিতের ফলে ভারত এখন চাইলে পাকিস্তানকে না জানিয়েই পানি ধরে রাখতে বা প্রবাহের দিক বদলাতে বিদ্যমান অবকাঠামোতে পরিবর্তন আনতে বা নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারবে। চুক্তি অনুযায়ী, ভারতকে পাকিস্তানের সঙ্গে পানিসংক্রান্ত তথ্য ভাগাভাগি করতে হয়—যা বন্যা পূর্বাভাস এবং সেচ, পানিবিদ্যুৎ ও সুপেয় পানির পরিকল্পনায় অপরিহার্য। তবে পাকিস্তানের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, চুক্তি স্থগিতের আগে থেকেই ভারত পানিসংক্রান্ত তথ্য ভাগাভাগি ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিয়েছিল।
• পাকিস্তানের কৃষির বেশির ভাগ ফসল আসে পাঞ্জাব রাজ্য থেকে। আর পাঞ্জাবের ৭০ থেকে ৮০ ভাগ কৃষির কাজে সেচের পানির জোগান আসে সিন্ধু ও অন্যান্য শাখা নদী থেকে। সেখানে বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় সিন্ধু নদ ও এর শাখা নদ–নদীগুলোর পানি দিয়ে। ভারত বড় বাঁধ ও জলাধার নির্মাণ করে বর্ষা মৌসুমে পানি ছেড়ে দিলে অতি বন্যাও দেখা দিতে পারে।
• ভারত নিজেও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় চীনের ভাটিতে রয়েছে। আর সিন্ধুর উৎপত্তি তিব্বতে। তিব্বতে কয়েকটি পানিবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পর চীন এখন ইয়ারলুং সাংপো নদীর(যা উত্তরপূর্ব ভারতে ব্রহ্মপুত্রে পরিণত হয়) ভাটি এলাকায় বিশ্বের বৃহত্তম বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। বেইজিংয়ের দাবি, এ বাঁধ নির্মাণের পরিবেশগত প্রভাব হবে খুবই সামান্য। কিন্তু ভারতের আশঙ্কা, এ বাঁধ চীনের হাতে নদীর পানিপ্রবাহের ওপর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ এনে দেবে।
• বিশ্লেষকরা বলছেন – ভারত নিজেই ব্রহ্মপুত্র ও চীন থেকে উৎপন্ন অন্যান্য নদীর ভাটি অঞ্চলের দেশ। চুক্তি লঙ্ঘন করে বা চুক্তির বিষয়ে একতরফা কাজ করার মাধ্যমে ভারত এমন নজির স্থাপন করতে যাচ্ছে, যা একদিন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতে পারে। এই ধরনের পদক্ষেপের পর অন্যান্য আন্তর্জাতিক আলোচনায় নিজেকে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে প্রমাণ করা ভারতের জন্য কঠিন হবে।


