আপনি কি ইদানীং-এর মধ্যে একটা বই একটানা পড়ে শেষ করেছেন? কিংবা এমনও হতে পারে একটু পড়া শুরু করেই ফোনের স্ক্রিনে আঙুল চলে গেছে ইনস্টাগ্রামে, হোয়াটসঅ্যাপে বা হয়তো ‘চ্যাটবটকে জিজ্ঞেস করি হাতে এই আঁচিলটা ক্যান্সার কিনা’ জাতীয় কিছুর খোঁজে। এমনটা শুধু আপনার নয়, পুরো একটি প্রজন্মের মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক অভ্যাস হয়ে উঠেছে। আর এখানেই প্রশ্ন উঠে, আমরা কি ক্রমশ এমন এক সমাজে প্রবেশ করছি, যেখানে ‘পড়ার’ বদলে শুধু ‘দেখা ও বলা’ই বেঁচে থাকবে?
Gallup এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে আমেরিকান প্রাপ্তবয়স্করা ইতিহাসে সর্বনিম্ন সংখ্যক বই পড়েছে। National Center for Education Statistics জানায়, ১৯৮৪ সালে যেখানে ৩৫% ১৩ বছর বয়সীরা “প্রায় প্রতিদিন” বই পড়তো, ২০২৩ সালে তা নেমে এসেছে ১৪%-এ। অথচ আমরা দিনে গড়ে দুই ঘণ্টার বেশি সময় কাটাই সোশ্যাল মিডিয়ায় যেখানে শব্দ আছে, ক্যাপশন আছে, কিন্তু নেই গভীর পাঠ। আমেরিকান সমাজে এই ‘ডিপ রিডিং’ বা গভীর পাঠের ক্রমহ্রাস এমন একটি মানসিক কাঠামোর অবক্ষয় ঘটাচ্ছে যা যুক্তিবোধ, আত্মসমালোচনাশীলতা ও সামাজিক সহনশীলতাকে তৈরি করতো। একে বলে ‘Deep Literacy’—যেটি শুধু বই পড়া নয়, বরং চিন্তা গঠনের এক ধরণ।
দার্শনিক ওয়াল্টার ওং তার “Orality and Literacy” বইতে বলেন, লিখিত ভাষা মানুষের চিন্তার কাঠামো বদলে দেয়। মৌখিক সংস্কৃতিতে কথা মনে রাখার জন্য পুনরাবৃত্তি, উপমা ও সহজ শব্দচয়নের প্রয়োজন হয়। তাতে জটিল তর্ক বা বিমূর্ত চিন্তা করা কঠিন হয়। তিনি বলেন, লিখিত ভাষা মানুষের ভাবনাকে বিমূর্ত করে তোলে, আত্ম-অন্বেষণ ও যুক্তিপূর্ণ যুক্তি তৈরি করে। এটি ছিলো এমন এক মানসিক বিপ্লব যা গণতন্ত্র, বিজ্ঞান ও মানবাধিকার চেতনার ভিত্তি গড়ে তোলে।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে মানুষ আবার এমন এক মৌখিক সমাজে প্রবেশ করছে, যেটা ওয়াল্টার ওং বলেছিলেন প্রাক-সাক্ষর সংস্কৃতি ।TikTok, Reel, Meme, Emoji—এসব সংক্ষিপ্ত, আবেগনির্ভর ও মুখরোচক উপাদান মানুষের মনকে আবারও সংক্ষিপ্ত, সহজবোধ্য এবং দলভিত্তিক ভাবনার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ধারণা ছড়ানোর জন্য এখন আর তথ্যের সত্যতা প্রয়োজন হয় না বরং কি ভাইরাল হয় সেটাই সত্যের মানদণ্ড। সমাজে এমন এক অবস্থা তৈরি হচ্ছে যেখানে ভাবনা নয়, সামাজিক অনুমোদনই যুক্তির বিকল্প হয়ে উঠছে।
রাজনৈতিক মেরুকরণ ও চরমপন্থা বেড়েছে, কারণ যুক্তির বদলে আবেগ দিয়ে মত গঠন করা হচ্ছে। এখন “লিভড এক্সপেরিয়েন্স” (ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা) বহু ক্ষেত্রে প্রমাণের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এর ফলে ভাবনার বৈচিত্র্য বা বিরোধ সহ্য করার ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রতিটি মতবাদের পেছনে দাঁড়িয়ে যায় আলাদা শ্রেণি বা গোষ্ঠী। মানুষ আর যুক্তি দেখে না, দেখে কে বলেছে তারপরেই মত গঠন করে।
এই আলোচনা মূলত আমেরিকান সমাজের উদাহরণ দিয়ে শুরু হলেও কিন্তু এর প্রতিধ্বনি আমরা বাংলাদেশে আমাদের সমাজেও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। স্কুল-কলেজে বই পড়ার প্রতি অনাগ্রহ বাড়ছে, পাঠ্যবইয়ের বাইরের সাহিত্য, ইতিহাস বা সমাজবিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহ ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। আগে যেখানে পাড়ার পাঠাগারে বা স্টল থেকে মাসিক ম্যাগাজিন কিনে পড়া হতো, সেখানে এখন স্ক্রিনে চোখ, রিলে মন এবং শিরোনামে মনোযোগ সীমাবদ্ধ।
বইমেলা যতটা জমে, তার বড় একটা অংশই হয়ে দাঁড়ায় ইভেন্ট বা ফটোশ্যুট। পড়া আর আত্মস্থ করার মধ্যকার যে নিবিড় সম্পর্ক, তা অনেকটাই প্রতীকী হয়ে গেছে। ‘শেয়ারযোগ্যতা’ই হয়ে উঠছে তথ্য গ্রহণের একমাত্র মানদণ্ড। বাংলাদেশে রাজনৈতিক বা সামাজিক মতবিনিময়েও এই ডিজিটাল মৌখিকতা প্রবলভাবে বিরাজ করছে। যুক্তিভিত্তিক আলোচনা দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা বা দলগত অনুরাগ-বিদ্বেষের জায়গায় মতামত গড়ে উঠছে।
আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে আমাদের পছন্দ ঠিক করবে সমাজের ভবিষ্যৎ। আমরা কি আবারও একটি মৌখিক, আবেগনির্ভর, প্রতিপক্ষ-নির্ভর সমাজে ফিরে যাবো? নাকি প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেও পড়ার, ভাবার ও বুঝে মত প্রকাশের ঐতিহ্যকে ধরে রাখবো?
পাঠ কেবল জ্ঞানার্জনের উপায় নয়, এটি আমাদের মানসিক পরিপক্বতার প্রতিফলন। সমাজ যতই বদলাক পাঠের গভীরতা ধরে রাখা না গেলে, আমরা হয়তো প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে থাকবো, কিন্তু মানসিক ও রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে যাবো এক আদিম জগতে।


