নেপালে রাজতন্ত্র ও হিন্দু রাষ্ট্র ফেরানোর দাবি , নেপথ্যে ভারত ?

নেপালে রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার দাবিতে সম্প্রতি রাস্তায় নেমেছে সেখানকার রাজতন্ত্র সমর্থকরা। তারা নেপালে হিন্দু রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিও জানাচ্ছে। নেপালের সাবেক রাজা জ্ঞানেন্দ্র বীর বিক্রম শাহ গত ৯ মার্চ পোখারা থেকে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে, তাকে স্বাগত জানানোর জন্য হাজার হাজার মানুষ অপেক্ষা করছিলেন। তিনি গত দুই মাস ধরে পোখারায় ছিলেন। বিমানবন্দরে রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টির (আরপিপি) শীর্ষ নেতারা ও কর্মীরা তাকে স্বাগত জানান। ১৯৯০-এর দশকে প্রতিষ্ঠিত আরপিপি এখনো রাজতন্ত্র পুনর্বহালের পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী দল। নেপালের সাংবাদিকদের তথ্য অনুযায়ী, সেদিন তার অন্তত ১০ হাজার সমর্থক বিমানবন্দরের প্রধান ফটকে উপস্থিত ছিলেন।

ওই দেশে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর রাজা জ্ঞানেন্দ্র শাহকে জনসমক্ষে প্রায় দেখা যায়নি বললেই চলে। কিছু বিশেষ অনুষ্ঠানের সময় তাকে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিতে দেখা গেছে। তবে গত কয়েক মাস ধরে তিনি বেশ সক্রিয়। সাবেক রাজা জ্ঞানেন্দ্রের সমর্থকরা নেপালের বিভিন্ন এলাকায় সমাবেশ করছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে গণতন্ত্র দিবসের পর থেকে রাজতন্ত্রপন্থীদের আন্দোলন আরও তীব্র হয়েছে। জ্ঞানেন্দ্র বলেন, “দেশ রক্ষা ও জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব নেওয়ার সময় এসেছে।” নেপালে ২৩৯ বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে ২০০৮ সালে গণতন্ত্রে এসেছিল। ওই দেশে ১৭ বছর হলো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে। কিন্তু এরই মাঝে ১১টা সরকার পরিবর্তন হয়েছে।

নেপালের সরকারের বিষয়ে জনগণের হতাশা রাজতন্ত্রের সমর্থকদের একটা সুযোগ করে দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। অধিকাংশ নেপালি তাদের প্রজাতন্ত্র ব্যবস্থা নিয়ে হতাশ। তারা মনে করেন, এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে ব্যর্থ হয়েছে। পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক সঙ্কট ও ব্যাপক দুর্নীতির জন্যও এটিকে দায়ী করা হচ্ছে। জ্ঞানেন্দ্রকে সরাসরি রাজনীতিতে যোগ দিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ওলি। রাজতন্ত্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর দুর্নীতি ও ব্যর্থ শাসনের অভিযোগ এনেছে। তবে জ্ঞানেন্দ্র রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবির বিষয়ে এখনও কোনও মন্তব্য করেননি। বিশ্লেষকরাও নিকট ভবিষ্যতে জ্ঞানেন্দ্রের ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা দেখছেন না।

নেপালে কিছু ঘটলেই সবার নজর থাকে ভারতের দিকে। গত রবিবার কাঠমান্ডুতে জ্ঞানেন্দ্র শাহকে স্বাগত জানাতে আসা সমর্থকদের ভিড়ে এক ব্যক্তির হাতে ছিল ভারতের উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের ছবি লাগানো পোস্টার। এই ছবি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই নেপালে বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে ভারতের সঙ্গে এই আন্দোলনের কোনো যোগ আছে কি না সেই বিষয়েও।জ্ঞানেন্দ্র ২০০২ সালে নেপালের রাজা হন। এর আগে তার বড় ভাই বীরেন্দ্র বীর বিক্রম শাহ দেব ও তার পরিবার রাজপ্রাসাদে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। তখন জ্ঞানেন্দ্র নির্বাহী ক্ষমতা ছাড়াই সাংবিধানিক রাজা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৫ সালে তিনি সম্পূর্ণ ক্ষমতা নিজের হাতে নেন।

তিনি সরকার ও পার্লামেন্ট বাতিল করেন। রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকদের কারাগারে পাঠান এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করেন।এরপর দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে শাসন চালান। নেপালে ১৯৯০ সালের আগে রাজনৈতিক দল গঠনের অনুমতি ছিল না। তবে গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের ফলে নির্বাচন চালু হয় এবং রাজতন্ত্র শুধু প্রতীকী ক্ষমতায় সীমিত হয়ে পড়ে। তবে ২০০৬ সালে ব্যাপক জনবিক্ষোভের মুখে জ্ঞানেন্দ্র ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। জ্ঞানেন্দ্র তখন একটি বহুদলীয় সরকারকে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। পরে ওই সরকার মাওবাদীদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির মাধ্যমে ১০ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে, যাতে হাজারো মানুষের প্রাণ গিয়েছিল।

নেপালের পার্লামেন্ট ২০০৮ সালে রাজতন্ত্র বিলুপ্তির পক্ষে ভোট দেয়। এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে ২৪৯ বছরের রাজতন্ত্রের অবসান হয়।নেপাল একটি ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। জ্ঞানেন্দ্র ক্ষমতা ছাড়েন এবং সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন শুরু করেন।এরপর থেকে তিনি কোনও সরকারি নিরাপত্তা কিংবা সুবিধা পাচ্ছেন না। রাজনৈতিক বিশ্লেষক লোেকরাজ বরাল এএফপিকে বলেন, “আমি রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার কোনও সম্ভাবনা দেখি না।… রাজনীতিবিদদের অযোগ্যতা বেড়েছে এবং তারা ক্রমেই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছেন। এই হতাশার প্রকাশই এসব সমাবেশ ও বিক্ষোভে দেখা যাচ্ছে।”



LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন