“… আমাদের আর্থসামাজিক ভিত কিন্তু অত্যন্ত দুর্বল। বড় ধরনের কোনো কিছু গ্রহণ করার অনুপযোগী বাংলাদেশের সমাজ– এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়। এখানে এক সময় উঠতি মধ্যবিত্তের বিকাশ ঘটেছিল, যাদের কণ্ঠস্বর বেশ উঁচু ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে– শেখা হাসিনার ১৫ বছর শুধু নয়, তারও আগে থেকে এখানে এমন একটা বিশ্রি শ্রেণি গড়ে উঠেছে, রাশিয়ার অনুকরণে যাদের বলা হচ্ছে অলিগার্ক। মাফিয়াতন্ত্রও আছে এখানে।
দেশের আসল ক্ষমতা এদের হাতে। সমাজটাকে তারা টাকা দিয়ে কলুষিত করে ফেলেছে। টাকা হলো এখন সামাজিক মর্যাদাসহ সবকিছুর মাপকাঠি। এ পরিস্থিতিতে সমাজটাকে আপনি একটু সভ্য-ভব্য করবেন, তা সম্ভব নয়।
… আমাদের সমাজের ভিতটা অলিগার্ক বা মস্তানদের হাতে। এদেরকে স্পষ্টভাবে, একেবারে ধরে ধরে একটা একটা করে উচ্ছেদ না করে কোনো টেকসই সংস্কার আপনি করতে পারবেন না।
বলা হচ্ছে, আমরা এমনভাবে সংস্কার করছি যাতে ফ্যাসিবাদ আর ফিরে না আসে। কিন্তু আর্থসামাজিক কাঠামো যদি দুর্বল, পচাগলা থেকে যায়, তাহলে সংস্কার টিকবে কীভাবে এখানে? এ ভিতের ওপর আপনি যতই সংস্কার করুন, দেখা যাবে কয়েক বছর পর আরেকটা রূপে ফ্যাসিবাদ আবার জেঁকে বসবে।
… এখানে অতীতে যেমন বহু গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, ভবিষ্যতেও তা হবে। যতদিন পর্যন্ত প্রজ্ঞাবান ও দৃঢ়চেতা নেতৃত্ব না আসবে, ততদিন এখানে স্থিতিশীলতা আপনি আশা করতে পারেন না। এক প্রকার গণঅভ্যুত্থানের ১০ বছরের চক্রে পড়ে যাবে দেশ।
… ত্যাগের দিক থেকে, গভীরতার দিক থেকে, মানুষের সাহসের দিক থেকে এবারের গণঅভ্যুত্থান সত্যিই অনন্য। মানুষের আকাঙ্ক্ষা এখানে বিশাল। কিন্তু এ আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য যে ধরনের নেতৃত্ব, রাজনীতি, চিন্তাভাবনা, দর্শন দরকার ছিল, তার ভীষণ অভাব আমি দেখছি। সময়ের এ আহ্বানে সাড়া দেওয়ার যোগ্যতা আমাদের বর্তমান নেতৃত্বের নেই বলে আমি মনে করি।
… আমিও ভেবেছিলাম, তারা(ছাত্ররা) দিশা দেখাবে। তাদের কিছু কথাবার্তাও আকর্ষণীয় ছিল। কিন্তু সেগুলোকে তারা সেভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, আপনি চট করে নেতা হতে পারবেন না। সে জন্য সময় লাগবে। সে সময়টার আগেই তারা নেতা হয়ে যাচ্ছে।
… ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের তরুণরা যা করেছে, নিঃসন্দেহে তা বিরাট কিছু। তাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো শেখ হাসিনার মতো ভয়ংকর এক শাসককে তারা শুধু পদত্যাগ নয়; দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে। পুলিশ বাহিনী থানা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। এর মধ্যে একটা বিপ্লবী সম্ভাবনা ছিল বলে আমি মনে করি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, সেখানে কোনো বিপ্লবী নেতৃত্ব ছিল না।
… আমরা গভীর এক সংকটে আছি। এ সংকট শুধু গণতন্ত্রের নয়; স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বেরও সংকট। এ থেকে উদ্ধারের জন্য প্রকৃষ্ট মাঝিমাল্লা দরকার। আমরা সেই মাঝিমাল্লার অপেক্ষায় আছি। “


