“… যারা ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন চায় না তারা মনে করে, এই সময়ের মধ্যে সংস্কারের জন্য যথেষ্ট সময় পাওয়া যাবে না এবং এখনই নির্বাচন হলে আগের সেই দুর্নীতিপরায়ণ, পরিবারতান্ত্রিক ও একব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থাই ফিরে আসবে। তাদের যুক্তি, আমরা যদি সেই আগের রাজনীতিতেই ফিরে যাই, তাহলে দেড় হাজারের বেশি ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ ব্যর্থ হয়ে যাবে। তাদের এই যুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কোনোভাবেই অবহেলা করার মতো নয়। ভবিষ্যতে আমরা যাই করি না কেন, সেখানে এই গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা—গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সব শ্রেণি ও ব্যক্তির অধিকার, সমতা, বৈষম্যহীনতা, আইনের শাসন, রাজনৈতিক জবাবদিহি প্রভৃতি থাকতে হবে।
কিন্তু, সংস্কার জরুরি হলেও সেটাকে নির্বাচন বিলম্বের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা উচিত না। সংস্কার যেমন জরুরি, তেমনি নির্বাচিত সরকারও জরুরি। দ্য ডেইলি স্টার এবং আমি নিজেও বারবার বলেছি যে সংস্কার ও নির্বাচন দুটোই দরকার এবং ডিসেম্বরের মধ্যেই সেটা সম্ভব। … ড. ইউনূসকে আরও পাঁচ বছর ক্ষমতায় রাখা উচিত—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন প্রচারণার কারণে নির্বাচন নিয়ে অনেকের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও বেড়ে গেছে। যদিও তার মর্যাদা, খ্যাতি ও জনমানুষের আস্থার কারণেই এমন প্রচারণা করছেন অনেকে। কিন্তু, এর পেছনে এমন কোনো পক্ষও থাকতে পারে, যাদের উদ্দেশ্য খুব একটা ভালো নয়।
… যত সৎ চিন্তা থেকেই আসুক না কেন, এই ধরনের কোনো উদ্যোগ রাজনৈতিকভাবে বিচক্ষণ কি না, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সম্ভব কি না, আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য কি না এবং ড. ইউনূসের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্য কল্যাণকর কি না, তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবা উচিত। … বিএনপি দ্রুত নির্বাচন চায় এবং সেটা যে পুরোপুরি স্বার্থহীন নয়, সেটা আমরা বুঝতে পারি। আমরা এটাও বুঝতে পারি যে নির্বাচন নিয়ে এনসিপির অনীহার পেছনে দলীয় স্বার্থ আছে এবং সংগত কারণেই তারা আগে সংস্কার এবং শেখ হাসিনাসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতা হত্যাকারীদের বিচার চায়। নির্বাচন এখন হোক বা পরে, জামায়াত উভয় প্রস্তাবেই রাজি থাকার পেছনেও রয়েছে দলীয় হিসাব-নিকাশ। ফলে, জাতীয় স্বার্থ সেই অগ্রাধিকারটা পাচ্ছে না, যেটা পাওয়া উচিৎ ছিল।
নির্বাচনে তিনটি প্রধান পক্ষ—অন্তর্বর্তী সরকার, রাজনৈতিক দলগুলো এবং ভোটার। এখন পর্যন্ত যেসব মতামত আমরা শুনেছি, তা প্রথম ও দ্বিতীয় পক্ষের। কিন্তু, সাধারণ মানুষ কী চায়, সেটা আমরা খুব কমই জানি। …তবে, অতীতের রিপোর্টিং ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অনুমান করা যায় যে, সাধারণ মানুষ ২০১৪ সালের পর থেকে হারিয়ে ফেলা ভোটাধিকার ফিরে পেতে চায়। কিন্তু একইসঙ্গে তারা স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান ইত্যাদিও চায়। আর ভোটাধিকার ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন উভয়ই নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব। কাজেই আমাদের প্রস্তাব, ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন হওয়া উচিত। তবে, ড. ইউনূসের আরও কিছুটা সময় চাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সর্বোচ্চ ছয় সপ্তাহ বাড়িয়ে এটা হতে পারে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি।”


