“… সংস্কারের এজেন্ডাকে অনেকে অন্তর্বর্তী সরকার বা এনসিপির এজেন্ডার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছেন। এর প্রভাব খোদ সংস্কার প্রক্রিয়ার ওপর গিয়ে পড়ছে। এতে অনেক মৌলিক সংস্কার বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হচ্ছে না, নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে তাদের ওপর জনমতের চাপও তৈরি হচ্ছে না। এ রকম কিছু মৌলিক সংস্কার হলো জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) গঠন; আনুপাতিক পদ্ধতির উচ্চকক্ষ; সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতি; একই ব্যক্তির একাধারে প্রধানমন্ত্রী, দলীয় প্রধান ও সংসদ নেতা না হওয়া; এক ব্যক্তির দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী না হওয়া, ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন ইত্যাদি। প্রধানমন্ত্রীর একচেটিয়া ক্ষমতার রাশ টেনে ধরার জন্য এই সংস্কারগুলো ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।
কেউ কেউ মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্বলতার সুযোগে উগ্রবাদী গোষ্ঠী মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। তাই সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যতটুকু সংস্কার প্রয়োজন, ততটুকু সংস্কার করে দ্রুত নির্বাচন দেওয়াই মঙ্গলজনক।…উগ্রবাদী গোষ্ঠী মাথাচাড়া দেওয়ার পরিবেশ দেশে আগেও ছিল, এখনো আছে, নির্বাচনের পরও থাকবে, যদি রাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক রূপান্তর না হয়। … শুধু সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সংস্কার করাই যথেষ্ট নয়। নির্বাচনের পর যে সরকার ক্ষমতায় আসবে, সেই সরকার যেন স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে, তার জন্য বিভিন্ন কাঠামোগত সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ।
যেমন, সংবিধান সংস্কার না করেও আপাতত একটা সুষ্ঠু নির্বাচন করা যাবে। একইভাবে পুলিশ সংস্কার না করে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত না করে কিংবা আমলাতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো না করেও দেশে কোনোরকমে একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব। অতীতে বিভিন্ন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এই সংবিধান, পুলিশ, বিচার বিভাগ ও আমলাতন্ত্র বজায় রেখেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু তাতে নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসা সরকারের চরম স্বৈরাচারী হয়ে যাওয়া ঠেকানো যায়নি। … তার মানে আবার এই নয় যে কয়েক বছর সময় নিয়ে সব সংস্কার একবার শেষ করে নির্বাচন করতে হবে। এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংস্কার শেষ করে নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব।
… সংবিধান সংস্কার ছাড়া যেসব সংস্কার করা সম্ভব, সেসব সংস্কার ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগেই সম্পন্ন করতে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতির প্রয়োজন হবে। এ জন্য ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের শর্ত হিসেবে জনগুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক সংস্কারগুলোকে সামনে নিয়ে আসতে হবে। জনগণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো নির্বাচনের আগে ও পরে বাস্তবায়নের লিখিত অঙ্গীকারের বিনিময়ে ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা দেওয়া যেতে পারে।…এ ধরনের সমঝোতার পরিবেশ তৈরি করার জন্য নির্বাচন নিয়ে বিদ্যমান অনিশ্চয়তা দূর করতে হবে।
… যারা সত্যিকার অর্থেই স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতাকাঠামোর সংস্কার চায়, তাদের দায়িত্ব হলো ডিসেম্বরের মধ্যে সুনির্দিষ্ট টাইমলাইনসহ সুনির্দিষ্ট সংস্কারের দাবি তোলা। প্রশ্ন আসতে পারে সরকার ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের রোডম্যাপ দিলেই যে বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কারের ব্যাপারে একমত হতে পারবে, তার কী নিশ্চয়তা। এখানেই চলে আসে নাগরিকদের দিক থেকে ব্যক্তিগত ও সংগঠিত তৎপরতার প্রয়োজনীয়তা। … রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোরও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখা প্রয়োজন, যেন গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো নিয়ে শক্তিশালী জনমত তৈরি হতে পারে।
এভাবে এক ব্যক্তির দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রিত্ব না থাকা কিংবা ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন নিয়ে যে ধরনের জনমত তৈরি হয়েছে, পুলিশ, বিচার বিভাগ, আমলাতন্ত্র, গণমাধ্যম, নারী, শ্রম ইত্যাদি খাতের সংস্কার নিয়েও এ রকম জনমত তৈরি হবে এবং সেসব সংস্কার বাস্তবায়ন করতে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপ তৈরি হবে। ফলে নির্বাচনের আগে সব সংস্কার বাস্তবায়ন করা সম্ভব না হলেও নির্বাচনের পরও সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের চাপ বজায় থাকবে। মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র সংস্কার কোনো নির্দিষ্ট দলের এজেন্ডার বিষয় নয়, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্যই এসব সংস্কার অত্যাবশ্যক। সংস্কার বিতর্কে নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এই গণতান্ত্রিক রূপান্তর সম্ভব হবে না। “


