নিরোর জীবন ষড়যন্ত্র ও ইতিহাস

সম্রাট নিরো রোমান সাম্রাজ্যের সবচেয়ে কুখ্যাত শাসক, যার নাম শুনলেই ভেসে ওঠে অগ্নিকাণ্ড, নিষ্ঠুরতা আর রক্তপাতের ছবি। কিন্তু ৬৮ খ্রিস্টাব্দে তার মৃত্যু নিয়ে তৈরি হয় এক গভীর রহস্য, যা শতাব্দী জুড়ে মানুষকে ভাবিয়েছে ” নিরো কি সত্যিই মারা গিয়েছিলেন?” এই প্রশ্নের উত্তরে জন্ম নেয় অসংখ্য ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, যার কিছু অংশ আজও গবেষকদের আলোচনার বিষয়।

খ্রিস্টাব্দ ৬৮। নিরোর বিরুদ্ধে একের পর এক বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সেনেট তাকে “রাষ্ট্রশত্রু” ঘোষণা করে। সৈন্যরা এগিয়ে আসছে গ্রেপ্তার করতে। কিছু বিশ্বস্ত দাসের সঙ্গে আত্মগোপনে নিরো পালিয়ে যান এক পরিত্যক্ত বাড়িতে।

বলা হয়, শেষ মুহূর্তে সৈন্যদের পায়ের শব্দ শুনে, নিজের গলায় ছুরি চালিয়ে দেন তিনি। সেই সময় তার কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসে বিখ্যাত বাক্য— “Qualis artifex pereo!” (“কি মহান শিল্পী হয়ে আমি ধ্বংস হয়ে গেলাম!”) তবে প্রশ্ন থেকেই যায় এই মৃত্যু কি সত্যিই হয়েছিল? নিরোর মৃতদেহ জনসমক্ষে দেখা যায়নি। কেউ নিশ্চিত করে বলেনি যে তাকে কবর দেওয়া হয়েছিল। অথচ রোমান রীতি অনুযায়ী, রাষ্ট্রদ্রোহীদের মরদেহ জনতার সামনে এনে অপমান করা হতো। কিন্তু নিরোর ক্ষেত্রে যেন সবকিছু ছায়ার নিচে ঢাকা।

নিরোর কথিত মৃত্যুর পরে, ইতিহাসে অন্তত তিনজন Pseudonero-এর খোঁজ পাওয়া যায়, তারা সবাই নিজেকে আসল নিরো দাবি করেছিল। তাদের মধ্যে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ছিল এক ব্যক্তি, যিনি পার্থিয়ায় উপস্থিত হন। চেহারা, হাবভাব, বাদ্যযন্ত্র বাজানো সবই ছিল নিরোর মতো। তিনি ঘোষণা দেন—“আমি নিরো, রোম আমাকে মেরে ফেলতে পারেনি, আমি ফিরছি।”

পার্থিয়ার রাজাও প্রথমদিকে তাকে সমর্থন করেন। রোমের জন্য এটি ছিল রাজনৈতিক হুমকি। কারণ একজন মৃত সম্রাটের নামে যদি বিদ্রোহ গড়ে ওঠে, তাহলে মৃত্যুর ভয়ই বৃথা। এমনকি ২০ বছর পরেও যখন কেউ নিজেকে নিরো বলে দাবি করত, তখনও হাজার হাজার মানুষ তার পক্ষে জড়ো হতো। প্রশ্ন ওঠে একজন “মৃত” সম্রাট এত প্রভাব কীভাবে রেখে যায়?

প্রথম শতাব্দীর খ্রিস্টানরা নিরোকে একটি জীবন্ত অভিশাপের মতো মনে করত। খ্রিস্টান নিধনের জন্য তিনি ছিলেন এক আতঙ্কের নাম। আর তাই, নিরো মারা গেলেও তাদের বিশ্বাস ছিল সে আবার ফিরে আসবে।

এই বিশ্বাসকে বলা হয় Nero Redivivus Legend। বাইবেলের “Book of Revelation”-এ এক রহস্যময় “বিস্ট”-এর কথা বলা হয়েছে যার মাথা কাটা হয়েছে, তবুও সে বেঁচে উঠবে। অনেক গবেষক মনে করেন, এটি নিরোর প্রতীকী রূপ। খ্রিস্টান সমাজ ভাবত, নিরোই সেই “অ্যান্টিক্রাইস্ট” যে একদিন পৃথিবী ধ্বংস করতে ফিরবে। এই কিংবদন্তি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে এখনও খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বে নিরো একটি অশুভ প্রতীক হিসেবেই টিকে আছে।

নিরো ছিলেন আত্মপ্রেমে ডুবে থাকা এক রোমান সম্রাট। তিনি গান গাইতেন, থিয়েটারে অভিনয় করতেন, এমনকি নিজের অভিনয়ের জন্যই দর্শকদের জোর করে বসিয়ে রাখতেন। তিনি ছিলেন নিজের জীবনেরই নাট্যকার। তাহলে কি এটা খুব অবাক করার মতো যে তিনি নিজের মৃত্যুকেও একটা নাটক বানিয়েছিলেন? সৈন্যদের আসার আগেই আত্মগোপন করা। মৃতদেহের অনুপস্থিতি। গুজব ছড়ানো যে তিনি জীবিত।সব মিলিয়ে অনেক ইতিহাসবিদই বলেন নিরোর মৃত্যু ছিল তার জীবনের সর্বশেষ মঞ্চস্থ নাটক।

বিভিন্ন ইতিহাসবিদ এই ষড়যন্ত্রতত্ত্বকে Postmortem Mythmaking হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। আবার কেউ বলেন, এই গুজব ছিল রাজনৈতিক অস্ত্র রোমের শাসকরা চেয়েছিল নিরোর নামেই মানুষকে ভয় দেখাতে। কিন্তু ইতিহাসের এক অদ্ভুত সত্য হলো ভয়ের রাজা কখনও সহজে মরে না। তার মৃত্যু যত রহস্যময় হয়, গুজব তত শক্তিশালী হয়।

আজও কেউ কেউ বলেন, নিরো মরেনি। সে হয়তো পার্থিয়ায় পালিয়ে গিয়েছিল। হয়তো সে এক সন্ধ্যায় বাঁশি বাজিয়ে বসে ছিল ইরানের কোনো পাহাড়ি গ্রামের গুহায়। হয়তো এখনো, ইতিহাসের অন্ধকার কোনো করিডোরে নিরো বেঁচে আছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন