সিএনএন এর খবরে বলা হয়েছে – চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাথুরে এলাকায় এক্স-আকৃতির বিশাল একটি ভবন স্যাটেলাইট ছবিতে ধরা পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি একটি আধুনিক নিউক্লিয়ার ফিউশন গবেষণা কেন্দ্র, যা চীনকে শক্তির ভবিষ্যৎ গবেষণায় এগিয়ে নিতে পারে। প্রাপ্ত নথি অনুসারে, এটি একটি ‘লেজার ফিউশন’ গবেষণা কেন্দ্র। লেজার ফিউশন প্রযুক্তির মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা চরম তাপমাত্রা ও চাপে পদার্থের আচরণ পরীক্ষা করতে পারেন, যা তারকা বা পারমাণবিক বিস্ফোরণের সময় ঘটে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্রীয় টাওয়ারের চেম্বারে থাকা হাইড্রোজেন আইসোটোপের ওপর তাক করে চারটি বিশাল বাহু থেকে শক্তিশালী লেজার রশ্মি ছোঁড়া হবে। এর ফলে নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে, যা বিশাল পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন করতে পারে।
বিশ্বজুড়ে নিউক্লিয়ার ফিউশন শক্তিকে ভবিষ্যতের টেকসই ও অফুরন্ত জ্বালানির উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি পরিবেশবান্ধব ও কার্যকর, কারণ এতে প্রচলিত নিউক্লিয়ার ফিশনের মতো দীর্ঘমেয়াদি তেজস্ক্রিয় বর্জ্য তৈরি হয় না। এখনও পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র এক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে। ২০২২ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার ন্যাশনাল ইগনিশন ফ্যাসিলিটি (এনআইএফ) সফলভাবে প্রথম নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রতিক্রিয়া ঘটায়, যা বিজ্ঞানীদের জন্য বড় সাফল্য। তবে চীনের মিয়ানইয়াং গবেষণা কেন্দ্র যুক্তরাষ্ট্রের এনআইএফের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বড় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বড় আকারের লেজার আরও বেশি শক্তি উৎপাদনে সহায়তা করতে পারে।
ফিউশন এনার্জি ইনসাইটসের প্রধান নির্বাহী মেলানি উইন্ডরিজ বলেন, ‘চীন খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং কাজ এগিয়ে নিচ্ছে, যা তাদের অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়।’ বিশ্লেষক অ্যান্ড্রু হল্যান্ড বলেন, চীন যে গতিতে কাজ করছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যদি বিনিয়োগ না বাড়ায়, তবে ফিউশন গবেষণায় চীনই এগিয়ে যাবে। বিশ্ব শক্তির ভারসাম্য বদলে দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে এই প্রযুক্তির। ফলে, গবেষণা কেন্দ্রটি শুধু শক্তি উৎপাদনের ভবিষ্যৎই নয়, ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন হতে পারে দুই ধরনের বিক্রিয়ার মাধ্যমে। একটিকে বলে নিউক্লিয়ার ফিশন, অন্যটি নিউক্লিয়ার ফিউশন।
পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বা পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটাতে ইউরেনিয়াম পরমাণুকে একটি নিউট্রন দিয়ে আঘাত করে একে ভেঙ্গে ফেলা বা ‘ফিশন’ ঘটানো হয়। সমস্যা হল, এর জ্বালানি সহজলভ্য নয় এবং এ প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ তেজস্ক্রিয় বর্জ্য তৈরি হয়।নিউক্লিয়ার ফিউশনের সূচনা হয় ফিশন বিক্রিয়ার উল্টো প্রক্রিয়ায়। এক্ষেত্রে দুটি বা তার বেশি নিউক্লিয়াস যুক্ত হয়ে এক বা একাধিক ভিন্ন মৌলের পরমাণু তৈরি করে, সঙ্গে পাওয়া যায় বিপুল শক্তি।
সূর্যের মত নক্ষত্রে নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়ার মাধ্যমেই শক্তি তৈরি হয়। বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে পৃথিবীতে নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় সেই বিক্রিয়া ঘটানোর কৌশল উদ্ভাবনের চেষ্টা চালিয়ে আসছেন। সত্যি সত্যি যদি পৃথিবীতে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে নিউক্লিয়ার ফিউশন ঘটানো যায়, তার মধ্য দিয়ে দৃশ্যত অসীম পরিমাণ শক্তি উৎপাদন করা যাবে পরিবেশবান্ধব উপায়ে। এ প্রক্রিয়ায় কার্বন নির্গমন বা তেজস্ক্রিয় নিঃসরণের ঝুঁকিও তেমন বাড়বে না। বিবিসি-র মতে, এই শতকের দ্বিতীয় ভাগেই নিউক্লিয়ার ফিউশন একটি নির্ভরযোগ্য জ্বালানি উৎস হয়ে উঠতে পারে।


