ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজা যুদ্ধ শেষ করতে যুদ্ধবিরতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের চাপ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। শুক্রবার প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিস্তৃত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই অভিযোগ তোলা হয়েছে।
শতাধিক ইসরাইলি ও আমেরিকান কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে নিউ ইয়র্ক টাইমসের এই প্রতিবেদনটি দাবি করেছে, নেতানিয়াহু গাজা যুদ্ধ চলাকালে এমন একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যেগুলো তার নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে গৃহীত হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিলে একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতির চুক্তি সম্পন্ন করতে হামাসের সঙ্গে আলোচনা চলছিল। কিন্তু পরে কট্টরপন্থি মন্ত্রীদের সমর্থন আদায় ও সরকারে টিকে থাকতে নেতানিয়াহু আর চুক্তির পথে এগোননি।
নেতানিয়াহুর জন্য গাজায় চুক্তি ছিল ব্যক্তিগত ঝুঁকির কারণ। ইসরায়েলে তিনি একটি নড়বড়ে জোট সরকারের প্রধান, যা উগ্রপন্থি মন্ত্রীদের সমর্থনের ওপর দাঁড়িয়ে। এ মন্ত্রীরা চান পুরো গাজা উপত্যকা দখল করে নিতে। তারা সেনাসদস্যদের সেখান থেকে সরিয়ে নিতে চান না।
দ্রুত একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলে এই মন্ত্রীরা ক্ষমতাসীন জোট সরকার ভেঙে দিতে পারেন। এর মাধ্যমে ইসরায়েলে নতুন নির্বাচন হবে, যেখানে নেতানিয়াহু হেরে যেতে পারেন। আর প্রধানমন্ত্রীর অফিসের বাইরে যাওয়া মানে নেতানিয়াহু সংকটের আবর্তে পড়া। কারণ, ২০২০ সাল থেকে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা চলছে।
বাইডেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকে ইসরাইলি জনগণের জরিপ তুলে ধরেছিলেন। ওই জরিপে দেখা গেছে ৫০ শতাংশের বেশি মানুষ গাজা যুদ্ধ বন্ধ করে জিম্মি বিনিময় চুক্তি করতে চায়। এর উত্তরে নেতানিয়াহু বলেন, আমার ভোটারদের ৫০ শতাংশ তা চায় না।
আরও একটি উদাহরণ তুলে ধরে নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, ৯ জুন ইসরাইল ইরানের উপর হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল এবং ঠিক তার দুই দিন পর সংসদ ভেঙে দেওয়ার ভোট হওয়ার কথা ছিল। সেদিন নেতানিয়াহু জোট রক্ষা করতে হারেদি (অতিধার্মিক) নেতা মোশে গাফনিকে গোপনে জানান যে, ইরানে শিগগির হামলা চালানো হবে।
দুই দিন পর গাফনি ও তার দল ডিগেল হাতোরাহ জোট সরকারের পক্ষে ভোট দেয়। এর ফলে নেতানিয়াহুর সরকার ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা পায়। সেদিন রাতেই ইসরাইলি বিমানবাহিনী ইরানে হামলা চালায়।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, গাজা যুদ্ধকালীন নেতানিয়াহু একাধিক সিদ্ধান্ত নেন যেগুলো যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করে। এর পেছনে আছে তার রাজনৈতিকভাবে বাঁচার চেষ্টা, মিত্রদের সন্তুষ্ট করা এবং কৌশলে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা।
রিপোর্টে আরও তথ্য তুলে ধরা হয় যে, অক্টোবর ৭ এর আগের নয় মাসে নেতানিয়াহু তার শীর্ষ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে গেছেন। সাবেক আইডিএফ চিফ হার্জেল হালেভি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট এবং শিন বেত প্রধান রোনেন বার বারবার নেতানিয়াহুকে বলেন, তার সরকারের বিচার ব্যবস্থা সংস্কার পরিকল্পনা ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
এই অনুসন্ধান দক্ষিণ এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত বিশ্বের নেতৃত্বের রাজনৈতিক স্বার্থ বনাম জাতীয় নিরাপত্তা ও মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্নে এক গুরুতর বিতর্ক উত্থাপন করে।


