“পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির সাধারণত দৃশ্যপটের আড়ালে থেকে কাজ করতে পছন্দ করেন। তবে কাশ্মীরকে ঘিরে ভারতের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে এখন তিনিই পাকিস্তানের কণ্ঠস্বর হয়ে কঠোর ভাষায় বার্তা দিচ্ছেন।
… ভারত ও পাকিস্তানে জেনারেল মুনিরের বক্তব্যকে দেখা হচ্ছে তাঁর শক্ত অবস্থান প্রকাশ এবং জনসমর্থন আদায়ের চেষ্টা হিসেবে। এমন সময়ে তিনি জনসমর্থন পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছেন, যখন কিনা পাকিস্তান বছরের পর বছর ধরে চলা রাজনৈতিক বিভাজন ও অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত।
এমনকি এসব সংকটের কারণে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর প্রতি দেশটির জনগণের দীর্ঘদিনের অটুট আনুগত্যে চিড় ধরেছে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বহুদিন ধরেই পর্দার আড়ালে থেকে দেশটির রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
তবে জেনারেল মুনিরের সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়াকে কেবলই একটি রাজনৈতিক কৌশল বলে মনে হচ্ছে না, এর চেয়ে বেশি কিছু এখানে আছে। বিশ্লেষকদের মতে, তিনি ভারতের বিষয়ে কট্টর মনোভাব পোষণ করেন।
পাকিস্তানের দুই শীর্ষ সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি যে ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন, তার ভিত্তিতে বিশ্লেষকেরা এমন মত দিয়েছেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের কারণটা মূলত ধর্মীয়।
পেহেলগামে হামলা হওয়ার ছয় দিন আগে জেনারেল মুনির…ইসলামাবাদে এক অনুষ্ঠানে প্রবাসী পাকিস্তানিদের সামনে বক্তৃতাকালে কাশ্মীরকে দেশের ‘প্রাণশিরা’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
… আসিম মুনিরের এই মন্তব্যকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উসকানিমূলক উল্লেখ করে নিন্দা জানিয়েছে। কাশ্মীরকে ভারতের ‘অবিচ্ছেদ্য অংশ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে তারা।
বর্তমান সংকট আরও বাড়বে নাকি তা থামার পথ তৈরি হবে, তা অনেকাংশে আন্তর্জাতিক কূটনীতির ওপর নির্ভর করছে।…তবে এ ক্ষেত্রে কূটনীতি খুব একটা কাজে না-ও লাগতে পারে।
কারণ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি হিন্দু জাতীয়তাবাদী আদর্শ ধারণ করেন। তিনি নিজ দেশের এবং পাকিস্তানের মুসলিমদের হুমকি হিসেবে দেখেন।
… পেহেলগামে হামলার পর জেনারেল মুনির একেবারে স্পষ্টভাবে মতাদর্শিক ভাষায় কথা বলছেন। তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন না।
… অতীতে দেখা গেছে, ভারতের সঙ্গে উত্তেজনার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের জেনারেলরা প্রায়ই এই (দ্বি-জাতি) তত্ত্বকে সামনে এনেছেন। আবার কূটনৈতিক সমঝোতার সুযোগ আসামাত্রই তাঁরা সুর নরম করেছেন।
তবে এবার জেনারেল মুনির এই তত্ত্বকে যেভাবে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছেন এবং আরও যেসব আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেছেন, তার মধ্যে পাকিস্তানের নীতিতে মোড় পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছে ভারতীয়দের অনেকে।
… ২০১৯ সালে…জেনারেল আসিম মুনিরকে পাকিস্তানের প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের প্রধান পদে থেকে সরিয়ে দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। পরবর্তী সময়ে ইমরান খান জেনারেল মুনিরকে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগের বিরোধিতা করেছিলেন। আর তখন থেকেই তাঁদের দুজনের সম্পর্ক বৈরী হয়ে ওঠে।
সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার পর ইমরান খান ২০২২ সালের এপ্রিলে ক্ষমতা হারান। সাত মাস পর সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব নেন জেনারেল মুনির।
… যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত হোসাইন হাক্কানি বলেন, জেনারেল মুনির গভীরভাবে ধর্মচর্চায় নিবিষ্ট—আর এটাই ভারত সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে।
হাক্কানির মতে, আসিম মুনিরের কাছ থেকে সর্বোচ্চ যা আশা করা যায়, তা হলো তিনি উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের পথ খুঁজবেন। তবে সে ক্ষেত্রেও নিজের সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করে যাবেন।
এসবের মধ্য দিয়ে জেনারেল মুনির যেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অনেক বেশি ইসলামীকরণের চেষ্টা করছেন, যেমনটা সামরিক শাসক জেনারেল মোহাম্মদ জিয়াউল হক ১৯৮০-এর দশকে করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে জিয়াউল হক আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে জিহাদিদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিয়েছিলেন।
সমালোচকদের মতে, পাকিস্তানের রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থার ওপর ক্রমাগত সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন আসিম মুনির। সেই সঙ্গে ভিন্নমতকে কঠোরভাবে দমন করছেন।
… ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও পাকিস্তান সেনাবাহিনী বেশ হস্তক্ষেপ করছে বলে মনে হচ্ছে। ভবিষ্যতের যেকোনো শান্তি প্রচেষ্টা বা আলোচনা যেন সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণেই থাকে, তা নিশ্চিত করতে পাকিস্তানের গোয়েন্দাপ্রধানকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অথচ ঐতিহাসিকভাবে এ পদটি অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ও বেসামরিক মানুষদের জন্য বরাদ্দ ছিল।
এই মুহূর্তে দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক কার্যত স্থবির হয়ে আছে। আক্রমণাত্মক বার্তা ও হুঁশিয়ারি এখন দুই পক্ষের মধ্যকার যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে হিসাবনিকাশে ভুল হওয়ার ঝুঁকিটা প্রকট। …”


