ভারতের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিসরে বুদ্ধিজীবী সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্ববহ। তারা শুধু সাহিত্য, দর্শন বা বিজ্ঞান জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্রই নয়, বরং সময়ে সময়ে রাষ্ট্র ও সমাজের নীতি-নৈতিকতা, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা নিয়ে তীক্ষ্ণ বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু থেকেছে। নাসিরউদ্দিন শাহ থেকে শুরু করে আরুন্ধতী রায় দুটি সময়ের দু’জনই তাঁদের নিজ নিজ প্রেক্ষাপটে ভারতীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত ও দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে গিয়েছেন।
নাসিরউদ্দিন শাহ (১৯৪৯-২০২১) ভারতীয় থিয়েটার ও সিনেমার একজন কিংবদন্তি অভিনেতা ও চিন্তাবিদ ছিলেন। তিনি মূলত একজন শিল্পী হলেও, তার কাজ ও ভাষণে বুদ্ধিজীবীদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অবস্থান স্পষ্টরূপে ফুটে উঠেছে। তিনি ভারতীয় সংস্কৃতির বহুমাত্রিকতা ও ঐতিহ্যের একজন গর্বিত প্রতিনিধি।
শাহের চিন্তাধারা ছিল পরিমিত ও ঐতিহ্যনিষ্ঠ। রাষ্ট্রের প্রতি তার শ্রদ্ধা এবং সামাজিক শৃঙ্খলার গুরুত্ব ছিল স্পষ্ট। তিনি ভারতের ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতির গভীরে বিশ্বাসী ছিলেন এবং রাষ্ট্রের নিয়মনীতি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে অবস্থান নেন। তাঁর কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, নাসিরউদ্দিন শাহের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচয় ছিল একটি “জাতীয় ঐক্যের ধারণা” যেটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। রাষ্ট্রকে তিনি একটি ঐক্যবদ্ধ কাঠামো হিসেবে দেখতেন, যেখানে বুদ্ধিজীবীরা জাতির মূল ধারার অংশ হতে হবে।
আরুন্ধতী রায় সমকালীন ভারতের একজন সর্বাধিক বিতর্কিত লেখক ও বুদ্ধিজীবী, যিনি তাঁর সাহসী ও স্বাধীনমনা মতামতের জন্য পরিচিত। তিনি রাষ্ট্রের ওপর গভীর সন্দেহ ও সমালোচনা করেন এবং মানবাধিকার, সমাজবিচ্যুতি, নৃগোষ্ঠীয় অধিকারসহ নানা বিষয়ে রুখে দাঁড়ান।
রায়ের লেখালেখি ও বক্তব্যে মূলত দেখা যায় রাষ্ট্রের কর্তৃত্ববাদী দিক এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকে চ্যালেঞ্জ করার স্পষ্ট প্রবণতা। তিনি বুদ্ধিজীবী সমাজকে “রাষ্ট্রের নীতিবিরোধী” হওয়ার দায়িত্ব দিয়েছেন, অর্থাৎ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি স্বাধীন, সমালোচনামূলক মনোভাব বজায় রাখতে হবে। তাঁর ‘দ্য ডকুমেন্টস অব ইন্ডিয়া’ বা ‘দ্য ইনজুরি’ এর মতো লেখাগুলো ভারতীয় রাষ্ট্রের ভিতরে লুকিয়ে থাকা অন্যায় ও শোষণের চিত্র উপস্থাপন করে। রায়ের মতে, সত্যের স্বার্থে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো বুদ্ধিজীবীদের কর্তব্য।
নাসিরউদ্দিন শাহ ও আরুন্ধতী রায় এই দুইয়ের মধ্যে যে বুদ্ধিজীবী ও রাষ্ট্রের সম্পর্কের ভিন্নতা রয়েছে, তা একদিকে ভারতের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির প্রতিফলন, অন্যদিকে বুদ্ধিজীবীদের দৃষ্টিভঙ্গির মূল পার্থক্য। নাসিরউদ্দিন শাহের আত্মচিন্তা রাষ্ট্র ও জাতীয় ঐক্যের প্রতি নিবদ্ধ, যেখানে সমাজের স্থিতিশীলতা ও ঐতিহ্যের সম্মান অগ্রাধিকার পায়।
আরুন্ধতী রায়ের আত্মচিন্তা মূলত রাষ্ট্রের কর্তৃত্ববাদী ও শোষণমূলক দিকের বিরুদ্ধে রূঢ় প্রতিবাদ। বুদ্ধিজীবীদের তিনি রাষ্ট্রের বিচারক ও সংশোধনকর্তা হিসেবে দেখেন, যারা রাষ্ট্রের অন্যায় প্রকাশ ও সমালোচনা করতে বাধ্য। এই দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য ভারতীয় বুদ্ধিজীবী সমাজের একটি বড় অংশের প্রতিফলন।
নাসিরউদ্দিন শাহের সময় ভারত ছিল স্বাধীন হয়েছে মাত্র কয়েক দশক, যেখানে জাতীয় ঐক্য ও সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনীয়তা ছিল বিরাট।১৯৬০-৮০-এর দশকে ভারতীয় বুদ্ধিজীবীরা রাজনৈতিক দিক থেকে অপেক্ষাকৃত সংহত এবং জাতীয়তাবাদের প্রতি সম্মানসূচক ছিল। অন্যদিকে, আরুন্ধতী রায়ের কর্মকাল চলেছে ভারতীয় গণতন্ত্রের একটি ক্রমবর্ধমান বহুত্ববাদের যুগে, যেখানে রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাস অনেকাংশে কমেছে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর অন্ধ অনুসারিতা ও সংবিধানের ব্যঙ্গ বিস্তার ঘটায় বুদ্ধিজীবীরা রাষ্ট্রের প্রতি সংশয়ী ও সমালোচনামূলক। তাছাড়া নাসিরউদ্দিন শাহ প্রথাগত সাংস্কৃতিক ধারায় বিশ্বাসী ছিলেন, যেখানে রাষ্ট্র ও সমাজ একত্রে উন্নতির পথ অনুসরণ করবে; আর রায় সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেন, যেখানে রাষ্ট্র প্রায়শই সত্ত্বাধিকারী বা নিপীড়ক।
দর্শনের আলোকে বলতে গেলে, নাসিরউদ্দিন শাহের চিন্তাধারায় “সমাজের স্থিতিশীলতা ও ঐক্যের” নৈতিক আদর্শ ছিল, যেখানে বুদ্ধিজীবী ‘নৈতিকতা ও দায়িত্বের’ রক্ষাকারী। রাষ্ট্রের স্বার্থে তারা ‘নিয়ম ও শৃঙ্খলা’ বজায় রাখার পথ প্রশস্ত করে। অপরদিকে আরুন্ধতী রায়ের ভাবনায় “নৈতিকতা ও স্বচ্ছতার” চূড়ান্ত মূল্যবোধ ছিল। তিনি রাষ্ট্রকে শোষণ ও কর্তৃত্ববাদী হিসেবে দেখেন, যেখানে বুদ্ধিজীবী ‘নৈতিক সংশোধক’ ও বিচারক হিসেবে কাজ করবেন। এই চিন্তা বহুসংস্কৃতির, বহুস্বরের একটি রাজনৈতিক দর্শন।
নাসিরউদ্দিন শাহ থেকে আরুন্ধতী রায় দুই যুগের দুই বুদ্ধিজীবী, দুই ভিন্ন দর্শন ও রাজনীতির আঙ্গিক। তাদের আত্মচিন্তার পার্থক্য আমাদের শেখায় ভারতীয় বুদ্ধিজীবী সমাজ কখনো একক নয়, বরং বহুস্তর ও বৈচিত্র্যময়। রাষ্ট্র ও বুদ্ধিজীবীর দ্বন্দ্ব আজও অব্যাহত। জাতীয় ঐক্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষার সঙ্গে মুক্ত চিন্তার সাংঘর্ষিকতা ভারতীয় গণতন্ত্রের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।


