নারীরা কিভাবে জায়গা পাবে ! আমাদের নগর গুলো পুরুষের পরিকল্পনায় পুরুষের জন্য তৈরি

বিশ্বব্যাপী নগর পরিকল্পনা সাধারণত পুরুষদের দ্বারা এবং পুরুষদের জন্যই করা হয়ে থাকে। বিশেষ করে তরুণ এবং সুস্থ-সবল পুরুষদের জন্য। কিন্তু এই গোষ্ঠীর বাইরে যারা পড়ে, যেমন নারী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায় এবং অন্যান্য দুর্বল গোষ্ঠী, তাদের জন্য নগর পরিকল্পনায় যথেষ্ট জায়গা রাখা হয়না।

এখন বিশ্বজুড়ে ক্রমশই এই সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করা হচ্ছে এবং অনেক শহর এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি এক গবেষণায় দেখা যায়, বাস্কেটবল কোর্টের মতো খেলাধুলার স্থানগুলি সাধারণত ছেলেদের দখলে চলে যায়, ফলে মেয়েরা সেখানে নিজেদের অনুপযুক্ত মনে করে। এর সমাধান হিসেবে, ভিয়েনা শহরে বড় বড় পার্কগুলোকে ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত করা হয় এবং মেয়েদের জন্য আরামদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে বেঞ্চসহ বিভিন্ন সুবিধা সংযোজন করা হয়। এছাড়াও ২০০৬ সাল থেকে ভিয়েনায় জেন্ডার-বাজেটিং চালু করা হয়, যার মাধ্যমে নারী-কেন্দ্রিক সামাজিক বাসস্থান, নিরাপদ সংযোগ সড়ক এবং সংকীর্ণ গলিতে আয়না স্থাপনের মতো নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

সুইডেনের একটি স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান এক গবেষণা চালায়, মেয়েরা কেন ছেলেদের তুলনায় খেলার মাঠ কম ব্যবহার করে। তারা আবিষ্কার করে, মেয়েরা এমন স্থানে সময় কাটাতে চায় যেখান থেকে তারা পুরো এলাকা দেখতে পাবে কিন্তু চট করে চোখে পড়বে না। দুঃখের বিষয়, প্রতিষ্ঠানটি উপলব্ধি করেছিল যে, তরুণী মেয়েদের জন্য শহরে পরিকল্পিত কোনো স্থান তৈরি করা হয়না যেখানে তারা সহজে অংশগ্রহণ করতে পারে। এটি বোঝা যায় যে, শহরগুলো মূলত পুরুষদের দ্বারা এবং পুরুষদের জন্যই গড়ে উঠেছে। সারা বিশ্বজুড়েই জনসেবামূলক তথ্যভাণ্ডার, যেমন গুগল ম্যাপের মতো ওপেন সোর্স প্ল্যাটফর্মগুলোও সাধারণত পুরুষদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই গঠিত। নারীদের প্রয়োজনীয় স্থান যেমন শিশু যত্নকেন্দ্র, নারী নির্যাতন কেন্দ্র কিংবা নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র এগুলোর তথ্য অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত।

তবে নারীদের অধিকার আদায়ের জন্য কিছু দল ও সংগঠন ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। যেমন, মেক্সিকোতে ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত GeoChicas নামক একটি সংগঠন বর্তমানে ২২টি দেশে বিস্তার লাভকরেছে। এটি নারীদের জন্য নিরাপদ স্থান ও সহায়তার ঠিকানা চিহ্নিত করতে জনসাধারণের তথ্য ব্যবহার করছে। ভারতে দিল্লির একটি সংগঠন, ঝধভবঃরঢ়রহ, মহিলাদের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এক ধরনের ম্যাপ তৈরি করছে যেখানে বিপজ্জনক ও নিরাপদ এলাকাগুলোর মানচিত্র নির্ধারণ করা হয়েছে।

ভারতের অনেক শহরে নারীদের জনপরিসরে উপস্থিতি কেমন সেটি গবেষণা করে দেখা গেছে যে, দিল্লির পার্কগুলোতে পুরুষরা বেশিরভাগ সময় একা বা বন্ধুদের সাথে ঘুরতে গেলেও, নারীরা সাধারণত পারিবারিক জমায়েত ছাড়া পার্কে যাওয়ার কথা ভাবেন না। নিরাপত্তা ও শিশুদের খেলার স্থান নিশ্চিত করার ব্যাপারটি নারীদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও হায়দরাবাদে দেখা গেছে বড় পার্কগুলোর তুলনায় ছোট পার্কগুলোকেই নারী দর্শনার্থীরা বেশি পছন্দ করেন, কারণ সেখানে পুরো এলাকা সহজেই নজরে আসে এবং তারা সেখানে নিজেদের তুলনামূলক নিরাপদ অনুভব করেন। কিন্তু সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির প্রভাবও নারীদের জনপরিসরের ব্যবহার প্রভাবিত করে। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত নারীরা পার্কে নিয়মিত যেতে পারেন না, কারণ সেখানে প্রবেশের জন্য অর্থ দিতে হয়।

যদিও নগরায়ন অনেক সামাজিক বৈষম্য দূর করেছে, তবে তা আবার কিছু ক্ষতির কারণও হয়েছে।বেঙ্গালুরুর একটি পুনরুদ্ধার করা লেককে এখন পরিপাটি পার্কে রূপান্তর করা হয়েছে, যেখানে আগে গ্রামের নারীরা গৃহস্থালি ও কৃষিকাজ করতেন এবং উৎসব উদযাপন করতেন। কিন্তু শহরের আধুনিকীকরণের ফলে সেই ঐতিহ্যবাহী সামাজিক বন্ধন হারিয়ে গেছে। এভাবে নগর উন্নয়নের নামে প্রান্তিক নারীসমাজের ঐতিহ্যবাহী জীবিকা এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সংকুচিত হয়ে আসছে। অন্যদিকে বঞ্চিত জাতিগোষ্ঠীর নারীদের জন্য লেক এবং পার্কগুলোর পুনরুদ্ধার কিছুটা সুবিধা বয়ে আনলেও, এতে নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। পার্কগুলোকে পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল রাখার জন্য প্রবেশমূল্য ধার্য করা হয়েছে, যা অনেক নিম্নবিত্ত নারীদের জন্য বাধা সৃষ্টি করেছে। এরা আগে প্রতিদিন বিনামূল্যে পার্কে গিয়ে অবসর সময় কাটাতে পারত, যা এখন আর সম্ভব হয় না।

শহরগুলোর পরিকল্পনা করার সময় নারীদের বাস্তব চাহিদা এবং অভিজ্ঞতাগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। কিশোরী মেয়েরা স্বাধীনভাবে সময় কাটানোর জন্য নিরাপদ স্থান খুঁজে বেড়ায়, গৃহিণীরা অবসাদ ও একাকিত্ব দূর করার জন্য পার্কে যান, আর নিম্নবিত্ত ও অভিবাসী নারীরা দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা থেকে মুক্তির জন্য এমন স্থান খোঁজেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, শহরের পরিকল্পনায় তাদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা হয় না। সুতরাং শহরগুলোকে সত্যিকার অর্থে নারী-বান্ধব করে গড়ে তুলতে হলে আমাদের এখন থেকেই নারীদের কণ্ঠস্বর আরও জোরালো করতে হবে এবং শহরের জনপরিসরগুলোতে সকল শ্রেণি-পেশার নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে নগর পরিকল্পনার মূল ল্পনার মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে এবং বড় একটি জনগোষ্ঠী পরিকল্পনার বাইরে রয়ে যাবে।





LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন