একটা সময় ছিল যখন ‘নাগরিক’ পরিচয়টি ছিল গর্বের বিষয়। রাষ্ট্র, সমাজ ও সংস্কৃতির সাথে যার একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল। নাগরিক মানেই শুধু ভোটার নয়, পাঠক, প্রতিবাদকারী, সমাজচিন্তক, পাড়া-পড়শির পাশে থাকা একজন মানুষ। কিন্তু আজ? আপনি কি এখনো কেবল একজন নাগরিক, নাকি ধীরে ধীরে আপনি একজন কনজিউমার হয়ে যাচ্ছেন?
এই প্রশ্নটা নিছক দার্শনিক নয়। এটি আমাদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, সমাজে ভূমিকা এবং ভবিষ্যতের সামাজিক চুক্তির (Social Contract) সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রাষ্ট্র যদি আপনাকে আর নাগরিক হিসেবে না দেখে, বরং শুধু একজন “ব্যবহারকারী” বা “ক্রেতা” হিসেবে দেখে তবে আপনি কী হারাচ্ছেন?
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা একটি ভোক্তাকেন্দ্রিক সমাজ (Consumer Society) তৈরি করেছে। আমরা এখন যে তথ্য পড়ি, গান শুনি, ভিডিও দেখি, এ সবকিছু আমাদের চাহিদা নয়, বরং কর্পোরেট অ্যালগরিদমের প্রভাবের ফল। গুগল, মেটা, অ্যামাজনের মতো টেক জায়ান্টদের কাছে আমরা কেবল একটি “ডেটা প্রোফাইল” আমাদের বয়স, আগ্রহ, চিন্তাভাবনা, এমনকি রাজনৈতিক ঝোঁকও তারা জানে।নাগরিকতা যেখানে এক ধরণের অধিকারের কাঠামো ছিল, কনজিউমার হওয়া মানে আপনি সেখানে একটি টার্গেট মার্কেট। আপনি কী কিনবেন, কী দেখবেন, কী বিশ্বাস করবেন সবই নির্ধারিত হয় বাজারের খেয়ালে।
একটা সময় রাজনৈতিক অংশগ্রহণের মানে ছিল মিছিল, প্রতিবাদ, নির্বাচনে অংশগ্রহণ। কিন্তু এখন সমাজ ধীরে ধীরে “Scroll-based Engagement”-এ পরিণত হচ্ছে। আমরা ফেসবুকে রিয়্যাক্ট দিচ্ছি, টুইটারে মত দিচ্ছি কিন্তু বাস্তবে অংশ নিচ্ছি না। এর ফলে কী হচ্ছে? আমরা একটা “ইমোশনালি একটিভ, কিন্তু সামাজিকভাবে নিষ্ক্রিয়” প্রজন্ম তৈরি করছি। নাগরিক পরিচয় ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে এবং এর শূন্যস্থান পূরণ করছে ব্র্যান্ড আইডেন্টিটি—আপনি কী ফোন ব্যবহার করেন, কোন মিউজিক শোনেন, কোন ব্র্যান্ডের জামা পরেন।
২০২৪ সালের একটি গবেষণায় (Harvard Kennedy School) বলা হয়, বর্তমান বিশ্বে ৭৮% রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই কোনও না কোনওভাবে অ্যালগরিদমিক ফিল্টার দ্বারা প্রভাবিত। আমরা যা দেখি, যা জানি তা আর নিরপেক্ষ নয়। এই অ্যালগরিদম আমাদের নাগরিক পরিচয়কে নিয়ন্ত্রণ করছে। একদিক থেকে, আমরা যদি চিন্তা করার সুযোগই না পাই, যদি প্রতিটি তথ্যের আগে “স্পন্সরড” ট্যাগ থাকে, তবে আমরা নিজের মত তৈরিই বা করবো কীভাবে? তাহলে কি আমরা আর নাগরিক নই? আমরা কি শুধুই একটি “ইন্টার্যাকশন রেট”?
একটি ভয়ংকর প্রবণতা হলো রাষ্ট্রও এখন কর্পোরেট লজিক অনুসরণ করতে শুরু করেছে। তারা নাগরিকদের কথা শোনার পরিবর্তে “ইউজার স্যাটিসফ্যাকশন”, “ট্রাফিক এনালিটিকস”, “ডিজিটাল রেসপন্স রেট” এসব ভাষায় কথা বলছে। দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, এমনকি ইউরোপে নাগরিকত্ব এখন অনেকাংশে ডিজিটাল আইডি ও স্কোর-এর ওপর নির্ভর করছে। চীনের “সোশ্যাল ক্রেডিট সিস্টেম” তো এক ধরণের আধুনিক ডেটা-ভিত্তিক নাগরিকতা তৈরি করে ফেলেছে, যেখানে আপনি কীভাবে বাসে উঠলেন, কোথায় গিয়ে দাঁড়ালেন তা দিয়েই আপনার অধিকার নির্ধারণ হয়।
এই পরিবর্তন ঠেকানো সম্ভব নয়, তবে প্রশ্ন হলো আমরা কীভাবে এর মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় সংরক্ষণ করবো? আমাদের প্রয়োজন Digital Literacy, যাতে মানুষ বুঝতে পারে, কে কীভাবে তার চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করছে। নাগরিক আন্দোলন এখন অনলাইনেও হতে পারে, তবে তা যেন বাস্তব সমাজে প্রতিফলিত হয়। ব্যক্তি পরিচয়কে পণ্যিকরণ থেকে বের করে আনা জরুরি। মানুষকে মানুষ হিসেবে ভাবা দরকার, শুধু ডেটা প্রোফাইল হিসেবে নয়।


