বাংলাদেশে ইন্টারনেট প্রাপ্তি এখন শুধু প্রযুক্তিগত সুবিধা নয় একেবারে নাগরিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৪-এর ২(ভ) ধারায় এই অধিকার অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে, যা দেশের তথ্য অধিকার ও ডিজিটাল স্বাধীনতায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে এক গ্লানি-জর্জর বাস্তবতা। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় হাসিনা সরকার মোবাইল ইন্টারনেট এবং পরে ব্রডব্যান্ড বন্ধ করে দিয়ে সারা দেশে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ঘটায়। এতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের পাশাপাশি অনলাইন ব্যবসার বিশাল ক্ষতি হয়। এছাড়াও নানা সময়ে ইন্টারনেট বন্ধ ছিল একটি নিয়ন্ত্রণ কৌশল। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারনেট সোসাইটি পালস অনুসারে, ২০০৯-২০২৪ সাল পর্যন্ত অন্তত ১৭ বার ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হয়েছে।
বিশ্বপর্যায়ে ইন্টারনেটকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি ২০১১ সালে জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের সভায় সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। এর আগেই এস্তোনিয়া (২০০০), ফ্রান্স ও ফিনল্যান্ড (২০০৯), এবং কোস্টারিকা (২০১০) নিজ নিজ দেশে এ স্বীকৃতি দেয়। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০২০ সালে এই অধিকারকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৪ কোটি ১০ লাখ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। তবে গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে এখনও অবকাঠামো দুর্বল এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার ঘাটতি রয়ে গেছে। এই ব্যবধান ঘোচাতে সরকারের পাশাপাশি সিভিল সোসাইটি ও অ্যাক্টিভিস্ট প্ল্যাটফর্ম-সমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ‘শাটডাউন ওয়াচ’ নামক একটি ড্যাশবোর্ড ইতিমধ্যে চালু হয়েছে যা ইন্টারনেট বিভ্রাট পর্যবেক্ষণে সাহায্য করছে।
অন্যদিকে সরকারের নতুন উদ্যোগ স্টারলিংক ইন্টারনেট বাংলাদেশে দ্রুতগতির স্যাটেলাইট-ভিত্তিক ইন্টারনেট চালু করার পথে। সাবমেরিন কেবলনির্ভর বর্তমান ব্যবস্থার তুলনায়, স্টারলিংক প্রত্যন্ত এলাকাতেও শক্তিশালী ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করতে পারবে এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক কারণে ইন্টারনেট বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
সরকারের সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, স্টারলিংক সুবিধা এবং সিভিল সমাজের সক্রিয় পদক্ষেপ এই তিনের সম্মিলিত প্রয়াসে বাংলাদেশে সার্বক্ষণিক, মুক্ত এবং নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট প্রবেশাধিকার বাস্তবায়নের এক বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিতে বৈশ্বিক সংযুক্তি ও নাগরিক অধিকারে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে যাচ্ছে।


