” … ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ পর্বে বিউপনিবেশায়ন প্রক্রিয়ায় বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত যখন ঐতিহ্য-অনুসন্ধানী, তখন বাংলা নববর্ষ পালন তার অংশ হয়ে ওঠে। তবে ব্রিটিশ শাসনামলে এর পরিসর ছিল খুবই সীমিত। কিন্তু ১৯৪৭ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যখন পূর্ব বাংলা হিসেবে এক ঔপনিবেশিক শাসন থেকে আরেক আধা-ঔপনিবেশিক শাসনের কবলে পড়ে, তখন প্রথমেই আঘাত আসে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে মাতৃভাষা বাংলার ওপর। তখন ভাষা আন্দোলনের সূত্রে বাংলাদেশের বাঙালির ঐতিহ্যচেতনা প্রবল হয়ে ওঠে। বাংলা নববর্ষ হয়ে ওঠে এই ঐতিহ্যচেতনার গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য অংশ।
১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে তারা বাংলা নববর্ষ পালনকে ব্যাপকভাবে উৎসবমুখর করার অভিপ্রায়ে ওই দিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করে। যুক্তফ্রন্ট সরকার পাকিস্তানি শাসকদের বৈষম্যের শিকার হলে এবং পরে দেশব্যাপী সামরিক শাসন জারি হলে এই প্রক্রিয়ার অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়। কিন্তু বাংলাদেশের বাঙালিদের নবজাগ্রত জাতীয় চেতনা প্রতিবাদী মনোভাবে উজ্জীবিতই থাকে । সংস্কৃতির ওপর ঔপনিবেশিক আঘাতের একটি রূপ প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ পালনকে কেন্দ্র করে। তাতে বাঙালি সত্তার প্রতিবাদের যে দেশাত্মবোধক বলয় তৈরি হয়, তারই গর্ভ থেকে জন্ম নেয় ‘ছায়ানট’ নামের প্রতিষ্ঠানটির (১৯৬১)। বাঙালিত্বের চেতনা তীব্র হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬৪ সালে প্রাদেশিক সরকার বাংলা নববর্ষে ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।
এর মধ্যে দেশে স্বাধিকার আন্দোলন তীব্রতর হওয়ার পটভূমিতে বাংলা নববর্ষ পালনে ছায়ানট একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করে। ১৯৬৭ সালে বাংলা নববর্ষের প্রভাতে রমনার অশ্বত্থমূলে তারা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে যে ধারার সূচনা করে, তা বাংলাদেশের বাঙালিদের নববর্ষ উদ্যাপনকে নতুন তাৎপর্য দিয়েছে। প্রতিবছর তারা যেমন নিয়মিতভাবে এ অনুষ্ঠান আয়োজন করে ঐতিহ্যসমৃদ্ধ ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, তেমনি সারা দেশে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের একটি জাতি-ধর্ম-বর্ণনিরপেক্ষ ধারাও প্রবলতর হয়েছে। … বাংলাদেশের সব মানুষকে একটি সাংস্কৃতিক ঐক্যসূত্রে গ্রথিত করার ক্ষেত্রে—ভাষা আন্দোলন ও বাংলা নববর্ষ—এই দুটি দিবস অসাধারণ দুটি দৃষ্টান্ত।
লক্ষ করার বিষয়, ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ঢাকাকেন্দ্রিক যে পূর্ববঙ্গীয় রেনেসাঁ সংঘটিত হয়, তা বাংলাদেশের বাঙালিদের জাতীয় চেতনাকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে স্বতন্ত্র করে তোলে।…পশ্চিমবঙ্গীয় নববর্ষের পূজা-পার্বণসংশ্লিষ্ট ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রাধান্য থেকে বাংলাদেশের নববর্ষ মুক্ত—একান্তভাবেই উদার ও অসাম্প্রদায়িক। … রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারায় বাংলা নববর্ষ পালনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ দিয়ে। ১৯৮৯ সালে সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে এর যাত্রা শুরু হলেও এর আবেদন শুধু জাতীয় গণ্ডি ছাপিয়ে গেছে। ২০১৬ সালে ইউনেসকো এটিকে বিশ্ব-ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর জনসংশ্লিষ্টতা, জনমুখিতা, সাংগঠনিক পরম্পরা, ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণিনিরপেক্ষতা, অংশগ্রহণের সর্বজনীনতা প্রভৃতি বিবেচনায় ইউনেসকো এই স্বীকৃতি দেয়।
দেশের চারুশিল্পীরা এর আয়োজনে থাকায় চিন্তার মৌলিকত্বে, বিচিত্র মোটিফের প্রতীকী তাৎপর্যে, বর্ণাঢ্যতায়, লোক-ঐতিহ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতায় মঙ্গল শোভাযাত্রা দ্রুত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পুরো দেশে এর কর্মকাণ্ড বিস্তৃত হয়ে পড়ে। … মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে সমাজের কোনো কোনো অংশ থেকে যে কিছু সমালোচনা আসেনি, তা নয়। এ বছরও বিষয়টি নিয়ে নানা বিতর্কের সূত্রপাত ঘটেছে। কিন্তু সত্য এই যে, মঙ্গল শোভাযাত্রা বাংলাদেশের নববর্ষ উদযাপনের গৌরবকে আরও প্রভাববিস্তারী করে তুলেছে। … নিজ নিজ ধর্মীয় সংস্কৃতি চর্চা করেও বৃহত্তর পরিসরে যদি সবাই যুক্ত হতে না পারি, তাহলে আমাদের জাতীয় ঐক্য ব্যাহত হবে। দেশ বা জাতির অগ্রগতির স্বার্থে সব শ্রেণি-ধর্মের মানবের মিলনের সাংস্কৃতিক সূত্র বজায় রাখা জরুরি। বাংলা নববর্ষ সেই মিলনের পথই আমাদের সামনে এনে দেয়। বাংলাদেশের বাঙালিরাই শুধু নন, এর সঙ্গে যুক্ত হন আদিবাসীরাও। এমন মিলনসূত্র আর কোনো উৎসবে নেই। “


