সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, যার জলে-বাতাসে মিশে আছে বাংলাদেশের প্রাণভূমি। কিন্তু বিস্তীর্ণ এই প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যের নদ-নদীর সঠিক সংখ্যা নির্ধারণে এখনো সরকারি কোনো পূর্ণাঙ্গ জরিপ হয়নি। যদিও গবেষকরা এখন পর্যন্ত সুন্দরবনে ২২৭টি নদীর অস্তিত্বের কথা উল্লেখ করেছেন, সরকারের খসড়া তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য নির্বাচিত হয়েছে মাত্র ৮০টির মতো নদী। সরকারের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানিয়েছেন, ‘সুন্দরবনের অনেক জায়গায় এখনো জরিপ হয়নি। যেসব নদীর কোনো না কোনো রেকর্ড আছে, আমরা কেবল সেগুলোই তালিকাভুক্ত করছি।’ এ থেকেই বোঝা যায়, জরিপ ছাড়াই অনেক প্রকৃত নদী এখনো তালিকার বাইরে রয়ে গেছে।
বন বিভাগের পূর্ববর্তী নথিপত্রে অনেক নদীকে ‘খাল’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, বিশেষ করে যেগুলো সরু বা সংযোগস্থলে রয়েছে।কিন্তু নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকি এর সঙ্গে একমত নন। তার মতে সুন্দরবনে প্রকৃত খালের অস্তিত্ব নেই, বরং স্থানীয় মৌয়াল ও বাওয়ালদের বোঝার সুবিধার্থে তারা ছোট নদীগুলোকে খাল বলতেন। মাহবুব সিদ্দিকির গবেষণা ও ২০২৩ সালে প্রকাশিত সুন্দরবন ও গাঙ্গেয় বদ্বীপের মোহনা বইয়ে ২২৭টি নদীর নামসহ বিস্তারিত তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাপিডিয়া ও এশিয়াটিক সোসাইটির তালিকায় ১৭৭টি নদীর নাম ছিল, আমি তার বাইরে আরও ৫০টি নদীর নাম সংযুক্ত করেছি। এগুলো খাল নয়, বরং আবহমানকাল থেকে নদী হিসেবে প্রবাহিত হয়ে এসেছে।’
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের খুলনা জেলার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী বিদুৎ কুমার সাহা জানিয়েছেন, খুলনা অংশে ২৯টি নদী অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একাধিক নাম, স্থানীয় ও কেতাবি নামের বিভ্রান্তি এবং বন বিভাগের খাল-বিষয়ক নথির কারণে যাচাই-বাছাই করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে সরকারপক্ষ বলেছে, তালিকায় বাদ পড়া নদীগুলো পরবর্তীতে জরিপের ভিত্তিতে যুক্ত করা হবে। রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেনও মনে করেন, সুন্দরবনের অনেক খাল প্রকৃতপক্ষে নদীর বৈশিষ্ট্য বহন করে। তিনি বলেন, ‘স্থানীয়রা যাকে খাল বলেন, তা বৈজ্ঞানিকভাবে নদীই হতে পারে। ঢাকার খিদির খাল যদি কনাই নদ নামে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেতে পারে, তবে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক খালগুলোকেও নদী হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কারণ নদীর সংজ্ঞা অনুযায়ী, এটি প্রাকৃতিক উৎস থেকে প্রবাহিত হতে হবে, আর সুন্দরবন তো পুরোটাই প্রাকৃতিক।’
২০২৪ সালের ২৭ মার্চ প্রকাশিত ১ হাজার ২৯৪টি নদ-নদীর খসড়া তালিকা তৈরি হলেও তাতে সুন্দরবনের অনেক নদীর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এই পরিস্থিতি নিয়ে নদী গবেষকদের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। খুলনার নদী গবেষকরা অভিযোগ করেন, সুন্দরবন, বরেন্দ্র অঞ্চল ও পার্বত্য এলাকায় প্রায় পাঁচ শতাধিক নদী খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এরপর ৩১ মার্চ এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশিত হলে নতুন করে সুন্দরবনের ৮০টির মতো নদী অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা-১ পরিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. রবীন কুমার বিশ্বাস জানিয়েছেন, ‘সুন্দরবনের খুলনা অংশের ২৯টি নদীসহ প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি নদী এখন পর্যন্ত তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে সম্পূর্ণ জরিপের ভিত্তিতে আরো নদী যুক্ত করা হবে।’
এই বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড়ায়, নদী ও খালের সংজ্ঞা নির্ধারণে কি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি অভিন্ন মানদণ্ড থাকা উচিত নয়? স্থানীয় অভিজ্ঞতা, ঐতিহাসিক রেকর্ড এবং আধুনিক ভূগোলবিদ্যার সমন্বয় ছাড়া সুন্দরবনের মতো জটিল অঞ্চলকে বোঝা অসম্ভব। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি স্পষ্ট, সুন্দরবনের নদ-নদী সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত কেবল একটি কারিগরি ইস্যু নয়, এটি পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং জাতীয় উত্তরাধিকার সংরক্ষণের প্রশ্ন। সুন্দরবনের নদীগুলো কেবল পানিপ্রবাহ নয়, এগুলো এ অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রের প্রাণরসায়ন। এসব নদী তালিকাভুক্তির মধ্য দিয়েই সুন্দরবনকে তার প্রকৃত মর্যাদা দেওয়া সম্ভব। নদী না হলে সুন্দরবন শুধু নামেই থাকবে বন, প্রাণবৈচিত্র্যে নয়। সুতরাং রাষ্ট্রের সদিচ্ছা ও বিজ্ঞানভিত্তিক সমন্বিত জরিপ এখন সময়ের দাবি।


