‘আমরা ছাত্রদের আহবানে এসেছি। তারা আমাদের প্রাথমিক নিয়োগকর্তা। দেশের আপামর জনসাধারণ আমাদের নিয়োগ সমর্থন করেছে। … তারা যখন বলবে আমরা চলে যাবো।“
“বৈষম্যহীন, শোষনহীন, কল্যাণময় এবং মুক্ত বাতাসের রাষ্ট্রের যে স্বপ্ন নিয়ে ছাত্র জনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, আমি তাদের সেই স্বপ্নপূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ। আমরা এমন একটি দেশ গড়তে চাই যেখানে প্রতিটি নাগরিকের মানবাধিকার থাকবে পুরোপুরি সুরক্ষিত। আমাদের লক্ষ্য একটিই। উদার, গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। আমরা এক পরিবার। আমাদের এক লক্ষ্য। কোনো ভেদাভেদ যেন আমাদের স্বপ্নকে ব্যহত করতে না পারে সেজন্য আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
জন স্বার্থের বিপরীতমুখী এক কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে দেশ পুনর্গঠনের কাজে হাত দিতে হয়েছে। মানবিক ও কল্যানকর রাষ্ট্র গড়তে রাষ্ট্র সংস্কারের কাজে সফল হতেই হবে।“
”এখনই সব দাবী পূরণ করার জন্য জোর করা, প্রতিষ্ঠানে ঢুকে ব্যক্তিবিশেষকে হুমকির মধ্যে ফেলা, মামলা গ্রহণের জন্য চাপ সৃষ্টি করা, বিচারের জন্য গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে আদালতে হামলা করে আগেই একধরনের বিচার করে ফেলার যে প্রবনতা তা থেকে বের হতে হবে। ছাত্র জনতার বিপ্লবের গৌরব ও সম্ভাবনা এসব কাজে ম্লান হয়ে যাবে, নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রচেষ্টাও এতে ব্যহত হবে।
যে অবস্থার মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি তা যেমন একটি দূর্যোগপূর্ণ সময়, তেমনি এটি জাতির জীবনে মস্ত বড় সুযোগ।
নতুন প্রজন্মের এই গভীর আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেবার সংগ্রামে আমি একজন সহযোদ্ধা হিসেবে তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছি। “
“ভবিষ্যতে সকল ধরনের বন্যা প্রতিরোধে পদক্ষেপ অভ্যন্তরীণ এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে যৌথভাবে নেয়ার আলোচনা শুরু করা হয়েছে।
আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের বিচারে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে তদন্ত হবে। গণ-অভ্যুত্থানে সকল শহিদের পরিবারকে পুনর্বাসন, চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় সরকার বহন, পর্যায়ক্রমে মিথ্যা ও গায়েবী সকল মামলা প্রত্যাহার এবং শহিদদের স্মৃতি ধরে রাখতে সরকার অতি দ্রুত “জুলাই গণহত্যা স্মৃতি ফাউন্ডেশন” প্রতিষ্ঠা করছে।
“ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা স্থাপন, ব্যবসা বাণিজ্যের সহায়ক পরিবেশ তৈরি এবং নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য ও মুল্যস্ফিতি নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ, ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘ মেয়াদি সংস্কারের জন্য ব্যাংক কমিশন গঠন, আর্থিক খাতে সার্বিক পরিস্থিতি এবং সংস্কার বিষয়ে একটি রূপকল্প তৈরি, শেয়ার বাজার-পরিবহণ খাতে চরম বিশৃঙ্খলা নিরসন, দূর্নীতি ও সম্পদ পাচারের বিচার করা হবে।
গত ১৫ বছরের দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও জনস্বার্থ বিরোধী চুক্তি সাক্ষর, প্রকল্পের নামে লুটপাট ইত্যাদি তথ্য নিয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রণয়নের জন্য ইতোমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
“বিচার বিভাগকে দুর্নীতি ও দলীয় প্রভাবমুক্ত করতে কার্যক্রম শুরু, স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে ।
বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, খুন, অপহরণ এবং আয়না ঘরের মত চরম ঘৃণ্য সকল অপকর্মের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে। গুম বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির পক্ষরাষ্ট্র হওয়া সহ বিভিন্ন পদক্ষেপ, জনমুখী ও দলীয় প্রভাবমুক্ত ও জবাবদিহিতামূলক কাঠামো সৃষ্টির লক্ষ্যে পুলিশ কমিশন গঠন করে প্রয়োজনীয় সংস্কার হবে যাতে বাংলাদেশকে আর কোনো দিন কেউ যেন পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত না করতে পারে।ভবিষ্যতে কারো হুকুমে দেশপ্রেমিক কোনো বাহিনীর কোনো সদস্য যেন হত্যাকান্ড, গুম ও অত্যাচারে জড়িত হবার সাহস না করে।“
” স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করা হবে।
শিক্ষাক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের উদ্যোগ অন্যতম অগ্রাধিকার। পাঠ্যক্রমকে যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নেয়া হবে। কৃষকের স্বার্থ যেন স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে তা নিশ্চিত করা হবে।
প্রবাসী শ্রমিকদের প্রতি সকল পর্যায়ে সম্মানজনক আচরণ নিশ্চিত করা হবে।
স্বাস্থ্যখাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার, সকলকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা, হাসপাতালগুলোকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ এবং সেখানে সরকারি ডাক্তার সহ বিশেষজ্ঞদের নিয়মিত উপস্থিতি, দেশের সব অঞ্চলের মানুষের সমান স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা হবে।“
“তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে মত প্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত করে এমন সব আইনের নিপীড়নমূলক ধারা সংশোধন করা হবে। টেকসই এবং পরিবেশ বান্ধব উন্নয়ন করতে জীবাশ্ম জ্বালানি নিরুৎসাহিত করা।
শুধু জিডিপি একটি দেশের উন্নয়নের মাপকাঠি হতে পারে না।
পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হবে পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস ও সহযোগিতা, সকল রাষ্ট্রের সাথে বন্ধত্বপূর্ণ সম্পর্ক, মানবাধিকার আইনসহ সকল আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা। রোহিঙ্গা সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধানের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে কাজ করা হবে।”
“প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনী ব্যবস্থা, আইন-শৃঙ্খলা খাত এবং তথ্য প্রবাহে প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পূর্ণ করে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করা হবে। এর লক্ষ্য হবে দুর্নীতি, লুটপাট ও গণহত্যার বিরুদ্ধে একটি জবাবদিহীতামূলক রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সূচনা ।
আমরা ছাত্রদের আহবানে এসেছি। তারা আমাদের প্রাথমিক নিয়োগকর্তা। দেশের আপামর জনসাধারণ আমাদের নিয়োগ সমর্থন করেছে। আমরা ক্রমাগতভাবে সবাইকে বিষয়টি স্মরণ করিয়ে যাবো যাতে হঠাৎ করে এই প্রশ্ন উত্থাপিত না হয় আমরা কখন যাব। তারা যখন বলবে আমরা চলে যাবো।“
‘দেশবাসীকে অনুরোধ করবো, একটা আলোচনা শুরু করতে আমরা সর্বনিম্ন কী কী কাজ সম্পূর্ণ করে যাবো, কী কী কাজ মোটামুটি করে গেলে হবে। এই আলোচনার মাধ্যমে আমরা একটা দিক নির্দেশনা পেতে পারি। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক আলোচনা থেকেই আসবে।
নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে সুযোগ ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে আমরা অর্জন করলাম, এ সুযোগ এবার হারিয়ে ফেললে আমরা জাতি হিসেবে পরাজিত হয়ে যাব। শহিদ, আহত এবং জীবিত ছাত্র-জনতার কাছে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে আমরা এই অর্জনকে কিছুতেই হারিয়ে যেতে দেবো না। আমাদের দেশকে পৃথিবীর একটি শ্রদ্ধেয়, দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী দেশে পরিণত করতে আমরা শপথ নিয়েছি । “
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস


