ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সম্প্রতি সাতটি দেশকে ‘নিরাপদ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যার মধ্যে বাংলাদেশের নামও রয়েছে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ইউরোপে আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। ইউরোপীয় কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে গৃহীত অভিবাসন ও আশ্রয় চুক্তির কিছু দিক ২০২৬ সালের পরিবর্তে আগেই কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সেই লক্ষ্যে এখন ‘নিরাপদ দেশ’ হিসেবে এই তালিকাভুক্ত সাতটি দেশের মধ্যে কসোভো, কলম্বিয়া, মিশর, ভারত, মরক্কো এবং তিউনিশিয়ার পাশাপাশি রয়েছে বাংলাদেশ।
এই নতুন নীতির মূল লক্ষ্য হলো যেসব দেশের আবেদনকারীদের আন্তর্জাতিক সুরক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম, সেসব আবেদন তিন মাসের মধ্যে দ্রুত নিষ্পত্তি করা। ইউরোপীয় কমিশনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ক ও অভিবাসন কমিশনার ম্যাগনাস ব্রুনার জানান, “যেখানে আমরা দ্রুত এগোতে পারি, সেখানে আরও দ্রুত এগিয়ে যাওয়া উচিত। অনেক সদস্য রাষ্ট্রে আশ্রয় আবেদনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আটকে রয়েছে, ফলে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে দ্রুততার প্রয়োজন বোধ করছি।” ইইউ-র এই উদ্যোগের মূল কারণ হলো অভিবাসনের বর্তমান বাস্তবতা। ২০১৫-১৬ সালে ইউরোপে অভিবাসীর ঢল নেমেছিল। এরপর থেকেই অভিবাসন নীতিতে সংস্কার আনার উদ্যোগ চলছিল। ২০২৩ সালেও ৩ লাখ ৮০ হাজার অবৈধ অভিবাসী ইউরোপে প্রবেশ করেছে, যা ইউরোপীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা ও সামাজিক ভারসাম্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় অভিবাসন নীতিতে কড়াকড়ি আরোপের প্রবণতা বাড়ছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৪৩ হাজার ২৩৬ জন বাংলাদেশি আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেছেন এবং ৪৭ হাজার ৭৭৮টি আবেদন তখনও ঝুলে ছিল। কিন্তু বাংলাদেশি আবেদনকারীদের মাত্র ৩.৯৪ শতাংশ সফল হয়েছেন। বাকি ৯৬.০৬ শতাংশের আবেদন নাকচ হয়েছে। এই নিম্ন সাফল্যের হারই ইইউ’র নতুন ‘দ্রুত প্রক্রিয়া’ নীতির মূল ভিত্তি। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে যাওয়া অভিবাসীদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হতে যাচ্ছে। ‘নিরাপদ দেশ’ ঘোষণার ফলে ইউরোপীয় দেশগুলো আর বাংলাদেশি আবেদনকারীদের নিরাপত্তার যুক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দেবে না। ফলে অনেক প্রকৃত নিরাপত্তা সংকটে থাকা ব্যক্তি ও সংখ্যালঘু গোষ্ঠীও আশ্রয় পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
বিশ্লেষক শরীফুল হাসান মনে করেন, “আগে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা বা গণজাগরণ মঞ্চের সময় নিরাপত্তাজনিত কারণে যারা ইউরোপে আশ্রয় চেয়েছিল, তাদের আবেদনকে যুক্তিযুক্ত বিবেচনা করা হতো। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ আবেদনকারী অর্থনৈতিক অভিবাসী, যাদের কারণ ইইউ গ্রহণ করছে না।” তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশকে ‘নিরাপদ’ ঘোষণা করায় এখন প্রকৃত সংকটে পড়া ব্যক্তিদেরও আশ্রয় পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে।”
মরক্কো, তিউনিসিয়া, মিশরের মতো দেশ থেকে ইউরোপে অবৈধভাবে আসা অভিবাসীদের পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে আসা বাংলাদেশিদের সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই পথ ব্যবহারকারীদের মধ্যে বাংলাদেশিরা ছিলেন শীর্ষে। আগে এদের আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতো, ফলে অনেকেই সেই সময়টুকু কাজে লাগিয়ে ইউরোপে কর্মসংস্থানে যুক্ত হতেন। এখন ‘দ্রুত নিষ্পত্তি’র নিয়মে এই সুযোগও সংকুচিত হয়ে আসবে।
ইতালির ডানপন্থি সরকার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। ইতালির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই সিদ্ধান্তকে রোমের জন্য “সাফল্য” বলে উল্লেখ করেছেন। তবে এর আগে একই দেশ মিশরীয় ও বাংলাদেশি নাগরিকদের আলবেনিয়ার বন্দিশালায় পাঠানোর চেষ্টা করেছিল, যা ইউরোপীয় বিচার আদালত আটকে দেয়। আদালতের ভাষ্য ছিল—যদি কোনো দেশের নির্দিষ্ট অঞ্চল বা গোষ্ঠী নিরাপদ না হয়, তবে সেই দেশকে পুরোপুরি নিরাপদ বলা যাবে না। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই সাতটি দেশের মধ্যে এমন অনেক দেশ রয়েছে, যেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার প্রমাণ রয়েছে। ‘ইউরোমেড রাইটস’ নামের একটি সংগঠন সতর্ক করে বলেছে, এই তালিকা বিভ্রান্তিকর ও বিপজ্জনক হতে পারে। যদিও ইউরোপীয় কমিশন স্পষ্ট করে বলেছে, সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে প্রতিটি আবেদন পৃথকভাবে বিবেচনা করতেই হবে।
এই ‘নিরাপদ দেশের তালিকা’ একটি গতিশীল তালিকা, যা সময়ের সাথে পরিবর্তনযোগ্য। কোনো দেশে যদি মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি ঘটে, তাহলে তাকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যেতে পারে। তবে এখনই বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ থেকে আসা অধিকাংশ আশ্রয়প্রার্থী রাজনৈতিক বা নিরাপত্তাজনিত কারণে নয়, বরং অর্থনৈতিক কারণে আশ্রয় প্রার্থনা করছেন। এই সিদ্ধান্ত শুধুই অভিবাসনের আইনি কাঠামো নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত আছে বৈশ্বিক রাজনীতি, নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। একদিকে ইউরোপের অভ্যন্তরীণ চাপে এই নীতি গ্রহণ করা হলেও, অন্যদিকে এটি বিশ্বব্যাপী অভিবাসন প্রত্যাশীদের জন্য একটি বড় বার্তা বহন করে—তাদের দেশে বাস্তব সংকট না থাকলে আর ‘নিরাপদ আশ্রয়’ মিলবে না।
সামগ্রিকভাবে ইইউ’র নতুন অভিবাসন নীতির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া যেমন দ্রুততর হতে যাচ্ছে, তেমনই সংকুচিত হচ্ছে দরজা—বিশেষ করে তাদের জন্য, যারা সত্যি সংকটে থাকা সত্ত্বেও এখন ‘নিরাপদ দেশের’ নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। বাংলাদেশের অভিবাসন প্রেক্ষাপটের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত। এখন প্রয়োজন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই বাস্তবতা সম্পর্কে নীতি নির্ধারণ, সচেতনতা ও মানবাধিকার বিবেচনায় যুক্তিযুক্ত পদক্ষেপ।


