সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় চীনের অগ্রগতি বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। একইসঙ্গে দেশটি বায়োটেক শিল্পেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। এতদিন চীন মূলত জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন, ওষুধের কাঁচামাল সরবরাহ ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। তবে এখন দেশটির ওষুধ উৎপাদনকারীরা সাশ্রয়ী প্রতিযোগিতামূলক ওষুধ তৈরির দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। বর্তমানে নতুন ওষুধ উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের পরেই চীনের অবস্থান। এর ফলে পশ্চিমা ওষুধ প্রস্তুতকারকরা ক্রমেই চীনের দিকে ঝুঁকছে।
পেটেন্ট মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় তারা ২০৩০ সাল নাগাদ ওষুধ বিক্রিতে বছরে প্রায় ১৪০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান এলইকে-র এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ওই সময়কালে পশ্চিমা ওষুধ উৎপাদনকারীদের চীনের ওষুধ লাইসেন্স নেওয়ার পরিমাণ ১৫ গুণ বেড়ে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। গত বছর পশ্চিমা ওষুধ প্রস্তুতকারকরা যতগুলো বড় (৫০ মিলিয়ন ডলার বা তার বেশি) লাইসেন্সিং চুক্তি করেছে, তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই হয়েছে চীনা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে, যা ২০২০ সালের চেয়ে তিনগুণ বেশি। চীনের সরকার প্রায় দুই দশক আগে বায়োটেক শিল্পকে কৌশলগত অগ্রাধিকারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। ২০১৫ সালে দেশটির জাতীয় ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বড় ধরনের সংস্কার শুরু করলে এই খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়।
এছাড়া কর্তৃপক্ষ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সহজ করে; উদ্যোগ নেয় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করার। পিকিং ইউনিভার্সিটির গবেষক ইমিন চুই-এর নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই সংস্কারের ফলে কোনো ওষুধ মানবদেহে পরীক্ষার প্রথম ধাপের অনুমোদনের সময় ৫০১ দিন থেকে কমে মাত্র ৮৭ দিনে নেমে আসে। এই সময়েই ‘সি টার্টলস’ নামে পরিচিত একদল চীনা বিজ্ঞানী, যারা বিদেশে গবেষণার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন, দেশে ফিরে আসেন এবং নতুন উদ্ভাবনে মনোযোগ দেন। চীনের বিশাল বাজারও বায়োটেক শিল্পের বিকাশে বড় ভূমিকা রেখেছে। ২০১৬ সালে বেসরকারি খাতে চীনের বায়োটেক খাতে বিনিয়োেগ যেখানে মাত্র ১ বিলিয়ন ডলার ছিল, ২০২১ সালে তা বেড়ে ১৩.৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
পর্যাপ্ত মেধা ও অর্থায়নের ফলে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো আর শুধু পশ্চিমা ওষুধের অনুলিপি তৈরি করছে না। তারা এখন ‘ফাস্ট-ফলোয়ার’ কৌশল নিয়েছে-অর্থাৎ বিদ্যমান ওষুধের উন্নত ও আরও নিরাপদ সংস্করণ তৈরি করছে। চীনের উদ্ভাবন যতই চমকপ্রদ হোক, দেশটি এখন বিশ্ব রাজনীতির জটিল বাস্তবতায় পড়েছে। আমেরিকার সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধের দাম তুলনামূলকভাবে কম নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় দেশটি চীনা বায়োটেক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় আয়ের উৎস। যদিও হাইটেক খাতে যুক্তরাষ্ট্রে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তবে চীনা বায়োটেক খাত এখন পর্যন্ত সেই ঝুঁকির বাইরে। তবে ইতিমধ্যে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পরীক্ষামূলক ওষুধের জন্য মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বীদের চাইতে কম মূল্যে লাইসেন্সিং চুক্তি করতে বাধ্য হচ্ছে, কারণ বিনিয়োগকারীরা ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে সন্দিহান।


