১৯৯৫ সালের জনপ্রিয় হলিউড সিনেমা Braveheart – এ এক দৃশ্যের কথা মনে করুন। স্কটিশ এক কৃষকের বিয়ের দিন, ইংরেজ সৈন্যরা হঠাৎ হাজির হয়। তারা বরকে আলাদা করে জিম্মি করে, আর কনেকে ধরে নিয়ে যায় এক প্রভুর ঘরে। বিয়ের প্রথম রাতের যৌন অধিকারের (Prima Nocte) নামে কনে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্ষণের শিকার হয়। সিনেমার ভাষায় এটি রাজা এডওয়ার্ডের ‘পুরোনো প্রথা’ পুনঃপ্রবর্তন তথাকথিত আইনসঙ্গত ধর্ষণ। তবে ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। ‘প্রথম রাতের অধিকার’ বিষয়টি সম্পূর্ণ কাল্পনিক, মধ্যযুগীয় স্কটল্যান্ড বা ইংল্যান্ডে এর কোনো প্রমাণ মেলে না। এটা ছিল ইংরেজ দখলদারিত্বের নৃশংসতা প্রকাশের এক নাটকীয় কৌশল। কিন্তু সিনেমা আমাদের মনে এমন একটা ধারণা গেঁথে দেয়-মধ্যযুগ মানেই অন্ধকার, বর্বরতা, আর ধর্ষণের স্বাভাবিকীকরণ।
এই ধরনের চিত্রায়ন শুধু যে ইতিহাসকে বিকৃত করে তা-ই নয়, বরং আমাদের সময়কে মিথ্যা ‘সভ্যতার উচ্চতায়’ বসিয়ে দেয়। প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি আমরা মধ্যযুগ থেকে এতটা এগিয়ে গেছি? নাকি ধর্ষণ নিয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি আজও সেই পুরনো পথেই হাঁটছে?
মধ্যযুগে ধর্ষণ: আইন ও বাস্তবতা
১২শ থেকে ১৬শ শতকের মধ্যে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডে ধর্ষণ ছিল ফৌজদারি অপরাধ। নারীরা নিজেরাই আদালতে গিয়ে অভিযোগ করতে পারতেন, বাবার বা স্বামীর অনুমতির প্রয়োজন হতো না। অনেক সময় এই মামলাগুলোর রায় ভুক্তভোগীর পক্ষে যেত।উদাহরণস্বরূপ, গ্লাসগোের পরিচারিকা ইসাবেল বার্ন জন অ্যান্ডারসনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ তোলেন। আদালত অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করে শহর থেকে নির্বাসিত করে।
১৫৬১ সালে স্কটল্যান্ডের এক আদালতে ধর্ষককে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়। ১৪০৫ সালে এক মা ও তার দুই কন্যা তাদের ধর্ষককে শারীরিকভাবে আঘাত করে প্রতিশোধ নেয়, এবং তারা পরবর্তীতে ক্ষমা পায়। এসব ঘটনাগুলো প্রমাণ করে-মধ্যযুগে ধর্ষণের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা ছিল, আর সমাজও সেটা কিছুটা হলেও স্বীকৃতি দিত। তবে এসব সত্ত্বেও বাস্তবতা ছিল কঠিন। ধর্ষণের অভিযোগ করতে হলে নারীদের তাৎক্ষণিকভাবে ও প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে হতো, এবং তা বারবার নানা কর্তৃপক্ষের সামনে বলতে হতো। শারীরিক আঘাত, ছেঁড়া জামা, বা রক্তাক্ত চুল না থাকলে অভিযোগ গ্রহণ করা হতো না।এইসব প্রমাণ না থাকলে আদালত ধর্ষণকে ‘সম্মতিমূলক সম্পর্ক’ হিসেবে ধরে নিত। পূর্বে যদি কোনো যৌন সম্পর্ক থাকত, তাহলে পরবর্তী ধর্ষণের অভিযোগ সহজেই বাতিল হয়ে যেত।
একটি ভয়াবহ উদাহরণ হলো ১৩০০ সালের দিকে ১১ বছর বয়সী জোয়ান সেলার-এর ঘটনা। সে অভিযোগ করেছিল যে, এক ব্যক্তি তাকে একটি কুঁড়েঘরে টেনে নিয়ে ধর্ষণ করেছে। আদালত তার বক্তব্যে কিছু তারিখের অসঙ্গতি খুঁজে পায় এবং অভিযোগ বাতিল করে দেয়। পরবর্তীতে জোয়ানকেই জরিমানা করা হয় এবং গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এই ঘটনাগুলো থেকে বোঝা যায়, আইনি কাঠামো থাকলেও তা ভুক্তভোগীদের জন্য কতটা প্রতিকূল ছিল। ধর্ষণের দায়প্রমাণের পুরো ভারটাই চাপিয়ে দেওয়া হতো নারীর উপর এবং প্রমাণের মাপকাঠি ছিল প্রায় অসম্ভব। একটি ভয়ানক অথচ প্রচলিত বিশ্বাস ছিল-যদি ধর্ষণের ফলে গর্ভধারণ হয়, তবে সেটা ধর্ষণ ছিল না। কারণ নারী যদি ‘আসলে না চাইত’, তাহলে তার গর্ভধারণ হতো না। ১৩১৩ সালের একটি মামলায় এই যুক্তি আদালতে গৃহীত হয়। এই ধারণা কেবল মধ্যযুগেই নয়, আধুনিক সময়েও ফিরে এসেছে।
২০১২ সালে মার্কিন রাজনীতিবিদ টড অ্যাকিন বলেন, ‘প্রকৃত ধর্ষণে নারীর শরীর নিজেই গর্ভধারণ প্রতিরোধ করে।’ এই বক্তব্য শুধুই ভ্রান্ত নয়, তা মধ্যযুগীয় কুসংস্কারের জীবন্ত নমুনা। মধ্যযুগীয় ধর্ষণ সংস্কৃতির মূল ভিত্তি ছিল-নারীকে অবিশ্বাস করা, নারীকে কামুক হিসেবে দেখা ও নারী-পুরুষের সম্মতির সীমাকে ঘোলা করে ফেলা। সেইসব মানসিকতা আজও টিকে আছে, কেবল একটু পাল্টানো রূপে। Netflix সিরিজ Unbelievable (২০১৯) বাস্তব ঘটনার ভিত্তিতে বানানো, যেখানে এক তরুণী ধর্ষণের অভিযোগ করার পর পুলিশ তাকে মিথ্যাবাদী হিসেবে অভিযুক্ত করে। পরে জানা যায়, সে ঠিকই বলেছিল। ২০২১ সালে মার্কিন কংগ্রেসওমেন আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ যখন যৌন নিপীড়নের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন, তখন অনেকেই সেটাকে ‘রাজনৈতিক নাটক’ বলে উড়িয়ে দেন।
এইসব ঘটনা দেখায়-আমরা হয়তো প্রযুক্তিতে, আইনকাঠামোয় উন্নত হয়েছি, কিন্তু মানসিকতায় অনেকটাই মধ্যযুগে আটকে আছি।ধর্ষণ কোনো নতুন সমস্যা নয়। সমাজ ও আইনের কাঠামোর মধ্যেই আজও এমন কিছু বিশ্বাস ও আচরণ গেঁথে আছে, যা ধর্ষণকে নিরুৎসাহিত না করে বরং লুকিয়ে রাখে, অবিশ্বাস করে, আর ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করে। মধ্যযুগীয় ধর্ষণ সংস্কৃতি ছিল অন্ধকার এক অধ্যায়, কিন্তু তা আমাদের বর্তমান সময়কে বিশ্লেষণের জন্য একটি দর্পণও বটে। আজকের প্রগতিশীল সমাজ তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নত হবে, যখন আমরা এই উত্তরাধিকারকে স্বীকার করব এবং প্রতিটি কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দিতে শিখব। যে কণ্ঠ আজও বলে, ‘আমার শরীর, আমার সম্মতি।’


