ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইনডিপেনডেন্ট-এর অনুসন্ধানে জানা গেছে, কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থীশিবিরে অবস্থানরত হাজার হাজার রোহিঙ্গা শিবির থেকে পালিয়ে মিয়ানমারের গভীর জঙ্গলে গিয়ে অস্ত্র ও যুদ্ধ কৌশল শিখছে। শান্তিপূর্ণভাবে ফিরে যাওয়ার আশা হারিয়ে অনেকে অস্ত্র হাতে নিচ্ছেন। তাঁদের একটাই লক্ষ্য-মিয়ানমারে ফিরে গিয়ে তাঁদের ভূমি ও অধিকার পুনরুদ্ধার করা। গত কয়েক বছরে শরণার্থীশিবিরের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। খাদ্য ও চিকিৎসা সংকট, শিক্ষা কাজ চলাচলের সুযোগহীনতা, দমন পীড়ন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশার কারণে অনেকে মিয়ানমারে ফিরে প্রতিরোধ গড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সংবাদমাধ্যম ইনডিপেনডেন্ট একাধিক রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের মধ্যে নিজেকে কমান্ডার হিসেবে দাবি করা এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, তারা গোপনে মিয়ানমারে যান। যেখানে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসব্যাপী সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নেন। সংগঠনের নাম প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি বলেন, “পুরো রোহিঙ্গা সম্প্রদায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা সবাইকে একটি প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার জন্য কাজ করছি।” সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আরাকান আর্মির সাথে সহযোগিতা করার প্রচেষ্টা ২০২১ সাল থেকে বারবার ব্যর্থ হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “তারা [আরাকান আর্মি] মুসলিম সম্প্রদায়ের সাথে কাজ করতে চায় না। তারা শুধুমাত্র বৌদ্ধদের জন্য কাজ করতে চায়। এখন, যে কেউ আমাদের পথে দাঁড়াবে-মিলিটারী বা আরাকান আর্মি-আমরা তাদের ধ্বংস করে আমাদের ভূমি ফিরিয়ে নেব।”
মোহাম্মদ আয়াস নামের ২৫ বছর বয়সী এক রোহিঙ্গা যুবক ইনডিপেনডেন্টকে সশস্ত্র প্রস্তুতির আদ্যোপান্ত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, তাদের লক্ষ্য জান্তা বাহিনী ও অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে প্রতিহত করে নিজেদের ভূমি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। আগে শুধু জান্তার সঙ্গে লড়াই করার চিন্তা ছিল, এখন প্রয়োজনে আরাকান আর্মির (এএ) বিরুদ্ধে তারা অস্ত্র ধরতে প্রস্তুত বলে জানান তিনি। মিয়ানমারে ২০২১ সালে গৃহযুদ্ধ শুরুর পর থেকেই এ প্রচেষ্টা ত্বরান্বিত হয়। কোন্ গ্রুপের অধীনে এই প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে-সে ব্যাপারে কিছু বলতে চাননি আয়াস। তিনি বলেন, ‘১ হাজারের বেশি লোক এখন যোগদান করেছে এবং প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। নিয়োগ হচ্ছে সব শিবিরে।’
ইসলামিক মাহাজ নামের একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত এক রোহিঙ্গাও ইনডিপেনডেন্টকে জানান, তারা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। এই ইসলামিক মাহাজ রোহিঙ্গা সলিডারিটি অরগানাইজেশনের (আরএসও) একটি অঙ্গ সংগঠন। ইনডিপেনডেন্ট বলছে, বাংলাদেশে অবস্থিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ডজনখানেক সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বেশ কয়েকবার এ নিয়ে উদ্বেগও জানানো হয়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে – এসব গ্রুপ মাদক, মানবপাচার, হত্যা, চাঁদাবাজি ও ক্যাম্পের অন্তর্কোন্দলের সঙ্গে যুক্ত। এ তালিকায় রয়েছে ইসলামিক মাহাজ, রোহিঙ্গা সলিডারিটি অরগানাইজেশন (আরএসও), আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি (এআরএসএ) ও আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি (এআরএ)।
রোহিঙ্গা শিবিরে কাজ করা মানবাধিকার সংস্থা ও সাহায্য সংস্থাগুলো বলছে শিবিরগুলোতে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী জোরপূর্বক ও স্বেচ্ছামূলক দুই উপায়েই সদস্য সংগ্রহ করছে। ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে এই ধরনের নিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে। রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা ফোর্টিফাই রাইটসের পরিচালক জন কুইনলি জানান, তারা বছরের পর বছর ধরে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে আসছেন। আরো মানুষ সশস্ত্র প্রতিরোধে অংশগ্রহণ করবে, যদি না বাংলাদেশের হোস্ট সরকার তাদের জীবিকা অর্জনের সুযোগ দেয় বা চলাচলের স্বাধীনতা প্রদান করে।
ফোর্টিফাই রাইটসের প্রতিবেদন অনুসারে, রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশে কর্মরত একটি মানবিক সমন্বয় গোষ্ঠী একটি অভ্যন্তরীণ স্মারকলিপি প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়, গত বছরের মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে শরণার্থী শিবির থেকে প্রায় ২ হাজার লোককে নিয়োগ করা হয়েছিল প্রশিক্ষণের জন্য। এই রিপোর্ট অনুসারে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ‘আদরশগত ও জাতীয়তাবাদী প্রচারণা এবং আর্থিক প্রলোভন, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, হুমকি ও জোরজবরদস্তি’ ব্যবহার করে লোকজনকে রিক্রুট করছে। বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গা প্রতিরোেধ আন্দোলন শুধু মিয়ানমার নয়, বাংলাদেশকেও নতুন সংকটে ফেলতে পারে। রোহিঙ্গাদের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রের তহবিল কমে যাওয়ায় হতাশা থেকে আরও বেশি মানুষ অস্ত্র হাতে নিতে বাধ্য হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।


