দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ব্রিটেনে আবাসন সংকট একটি দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। যুদ্ধ-পরবর্তী সময় থেকে বর্তমান পর্যন্ত ব্রিটেন ক্রমবর্ধমান বাড়ির দামের চাপ ও ঘাটতির মুখোমুখি। অথচ ১৯৩০-এর দশকে দেশটি এক নজিরবিহীন গৃহনির্মাণ বুম দেখেছিল। কীভাবে এই সংকট তৈরি হলো, কেন নীতিনির্ধারকদের নানা উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় ব্রিটেন কেন পিছিয়ে পড়ল-এসব প্রশ্নের উত্তর বিশ্লেষণ করা জরুরি।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় শ্রমিকরা সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ায় গৃহনির্মাণ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। ফলে শিল্পাঞ্চলে বাড়ি সংকট ও ভাড়া বৃদ্ধি ঘটে, যা ১৯১৫ সালে গ্লাসগোতে আট মাসের ভাড়া ধর্মঘটে রূপ নেয়। সরকার বাধ্য হয়ে ভাড়া ও মর্টগেজের হার যুদ্ধ-পূর্ব স্তরে স্থির করে দেয়। এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিম্নবিত্ত ভাড়াটিয়া বাড়িগুলোর বিনিয়োগ কমিয়ে দেয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৯১৯-১৯২৪ সালের মধ্যে সরকার স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে ভর্তুকি দিয়ে বড় আকারে পাবলিক হাউজিং নির্মাণ শুরু করে। ১৯২০-১৯৩৮ সালের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে ৬০,০০০ সরকারি বাড়ি নির্মিত হয়, যা শহরের স্লাম ক্লিয়ারেন্স ও নতুন সবুজ এলাকায় নতুন হাউজিং এস্টেট গড়ে তুলতে সহায়ক হয়। এই সময়েই লন্ডনের বিখ্যাত বেকনট্রি এস্টেট এবং ম্যানচেস্টারের উইদেনশো এস্টেটের মতো প্রকল্প গড়ে ওঠে।
১৯৩১ সালে ব্রিটেন স্বর্ণ মান ত্যাগ করলে সুদের হার কমে যায়, ঋণ সহজলভ্য হয় এবং ন্যূনতম পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রণের কারণে ব্যক্তিগত নির্মাণ ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। ১৯৩২-১৯৩৪ সালের মধ্যে ব্যক্তিগত বাড়ি নির্মাণ ১,৪২,০০০ থেকে ২,৮৬,০০০-এ পৌঁছে যায়। এই সময় শহরের বাইরে নতুন উপশহর গড়ে ওঠে।
তবে এই দ্রুত নগর সম্প্রসারণ ‘আরবান স্প্রল’ নিয়ে শহরতলির বাসিন্দাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ায়। আর্কিটেক্ট ও নগর পরিকল্পনাবিদদের নেতৃত্বে ১৯২৬ সালে গড়ে ওঠে ‘কাউন্সিল ফর দ্য প্রোটেকশন অফ রুরাল ইংল্যান্ড’ (CPRE)। তারা গ্রামীণ এলাকার সংরক্ষণ ও শহরের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার ঠেকাতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ১৯৩৫ সালে ‘রিবন ডেভেলপমেন্ট’ নিষিদ্ধ হয় এবং ১৯৩৭ সালে প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলিন CPRE-র নেতা প্যাট্রিক অ্যাবারক্রম্বিকে পরিকল্পনা কমিশনে যুক্ত করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ব্রিটেনের গৃহনির্মাণ কার্যত স্তব্ধ করে দেয়; ৪,৫০,০০০ বাড়ি ধ্বংস হয় এবং ৬ বছরে মাত্র ১,৯০,০০০ বাড়ি নির্মিত হয়। যুদ্ধ-পরবর্তী লেবার সরকার ১৯৪৭ সালে ‘টাউন অ্যান্ড কান্ট্রি প্ল্যানিং অ্যাক্ট’ পাস করে, যা ব্যক্তিগত নির্মাণ কার্যত নিষিদ্ধ করে এবং সরকারি উদ্যোগে ‘নিউ টাউন’ নির্মাণের ওপর জোর দেয়। লন্ডনের চারপাশে গ্রিন বেল্ট (সবুজ বেষ্টনী) গড়ে তোলা হয়, যেখানে নতুন বাড়ি নির্মাণ প্রায় পুরোপুরি নিষিদ্ধ ছিল।
নিউ টাউনস অ্যাক্টের মাধ্যমে লন্ডনের আশেপাশে দশটি নতুন শহর (যেমন: বাসিলডন, স্লাউ, ক্রলি, স্টিভেনেজ) গড়ে তোলা হয়। ১৯৭০ সালের মধ্যে এসব শহরে ৪,৭০,০০০ মানুষ বাস করত। তবে নতুন শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে স্থানীয় বিরোধিতা দেখা দেয়। গ্রিন বেল্টের কারণে শহরগুলোর আশেপাশে জমি সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং নতুন নির্মাণের সুযোগ কমে যায়। ১৯৫৫ সালের পর গ্রিন বেল্টের পরিধি ৯ মাইল থেকে ৩৫ মাইল পর্যন্ত বাড়ানো হয়, ফলে গ্রামীণ কাউন্টিগুলো কার্যত নতুন বাড়ি নির্মাণে ভেটো পাওয়ার সুযোগ পায়।
১৯৬০-এর দশকে দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ড ও মিডল্যান্ডসে জনসংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। সরকার ১৯৬২ সালে ৪ লাখ এবং ১৯৬৫ সালে ৫ লাখ নতুন বাড়ি নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করে, কিন্তু জমি বরাদ্দ ও স্থানীয় পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রণের কারণে তা অর্জিত হয়নি। যদিও বাড়ি মালিকানায় কর ছাড় ও মর্টগেজ ভর্তুকি দেওয়া হয়, জমি সংকটের কারণে এসব ভর্তুকি মূলত বাড়ির দাম বাড়িয়ে দেয়।
পশ্চিম ইউরোপের অধিকাংশ দেশ যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে গৃহনির্মাণে ব্রিটেনের তুলনায় বেশি সফল হয়। ইউরোপে সরকারি ও ব্যক্তিগত নির্মাণে সরাসরি ভর্তুকি এবং নমনীয় পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রণ ছিল। ব্রিটেনে অতিরিক্ত পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রণ, গ্রিন বেল্ট এবং স্থানীয় বিরোধিতার কারণে গৃহনির্মাণ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম হয়েছে। ফলে ১৯৭০-এর দশকের পর সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, ফিনল্যান্ডসহ অনেক দেশ মাথাপিছু বাড়ির সংখ্যায় ব্রিটেনকে ছাড়িয়ে যায়।
ব্রিটেনের গৃহনির্মাণ সংকট ইতিহাস, নীতিনির্ধারণ এবং স্থানীয় রাজনীতির জটিল মিশ্রণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত, কঠোর পরিকল্পনা আইন, গ্রিন বেল্ট, এবং স্থানীয় বিরোধিতা মিলিয়ে সংকট আরও গভীর হয়েছে। ইউরোপের তুলনায় ব্রিটেন পিছিয়ে পড়েছে মূলত নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে। ভবিষ্যতে এই সংকট সমাধানে প্রয়োজন বাস্তববাদী, নমনীয় ও স্থানীয় স্বার্থের সঙ্গে সমন্বিত নীতিমালা।


