দ্বিতীয় বছরের মতো শিল্পবাজারে মন্দা , ২০২৪ সালে বিক্রি কমেছে ১২%

বিশ্বব্যাপী শিল্প ও প্রাচীন সামগ্রীর বাজার টানা দ্বিতীয় বছরের মতো সংকোচনের মুখে পড়েছে। আর্ট বাসেল ও ইউবিএস কর্তৃক প্রকাশিত ২০২৪ সালের বার্ষিক ‘আর্ট মার্কেট রিপোর্ট অনুযায়ী, শিল্পবাজারে বিক্রির পরিমাণ ১২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৭৫০ কোটি ডলারে। এটি শিল্পবাজারের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ধস, যা গত ১৫ বছরে তৃতীয় বৃহত্তম পতন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।প্রতিবেদনটির লেখক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আর্টস ইকোনমিকসের প্রতিষ্ঠাতা ক্লেয়ার ম্যাকঅ্যান্ড্রু বলেন “সার্বিকভাবে শিল্পকর্মের বাজারে খুবই প্রতিযোগিতাপূর্ণ একটি বছর ছিল ২০২৪ সাল।” তার ভাষায়, সংগ্রাহকদের মধ্যে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে এবং নতুন শিল্পীদের প্রতি কৌতূহলের অভাব স্পষ্ট।

শিল্পবাজারে এ ধসের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ এবং ক্রয়-অভ্যাসের পরিবর্তন-এই তিনটি প্রধান অনুঘটকের সম্মিলিত প্রভাবে বাজারে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা দিয়েছে। ২০০৯ সালের বৈশ্বিক মন্দায় যেমন বিক্রি কমেছিল ৩৬ শতাংশ এবং ২০২০ সালের কভিড-১৯ মহামারীতে কমেছিল ২২ শতাংশ, ২০২৪ সালের ১২ শতাংশ পতনও সেই ধরণেরই এক বড় ধাক্কা। বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলেই শিল্প ও পুরনো সামগ্রীর বিক্রির পরিমাণ কমেছে। চীনে পতনের হার সর্বোচ্চ-৩৩ শতাংশ। শিল্পবাজারের নেতৃত্বদানকারী যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি কমেছে ৯ শতাংশ। ফ্রান্স ও ইতালিতে ১০ শতাংশ করে এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ১৫ শতাংশ কমেছে। ব্রেক্সিট-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাজ্যে পতনের হার ছিল তুলনামূলকভাবে কম, মাত্র ৫ শতাংশ এবং দেশটি এখনও বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্পবাজার হিসেবে টিকে আছে।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সমকালীন শিল্প খাত ভয়াবহ ধাক্কা খেয়েছে। নিলামে এ খাতে বিক্রি কমেছে ৩৬ শতাংশ, যা ২০১৮ সালের পর সর্বনিম্ন। উচ্চমূল্যের শিল্পকর্মগুলোর বিক্রিতেও সবচেয়ে বড় পতন দেখা গেছে। একসময় যা ছিল বাজারের চালিকাশক্তি, সেটিই এখন ক্রেতাদের অনীহার কেন্দ্রবিন্দুতে। ক্লেয়ার ম্যাকঅ্যান্ড্রু বলেন, “এখন ক্রেতারা কেবল তাদের চেনা শিল্পীদের কাজেই আগ্রহী। নতুন কিছু জানার বা সংগ্রহের আগ্রহ অনেকটাই হারিয়ে গেছে।” ফলে গ্যালারিগুলোও নির্ভর করছে মাত্র তিন-চার জন বিখ্যাত শিল্পীর ওপর, যাদের কাজ কিনতে ক্রেতারা আগ্রহী। শিল্পের জগতে একপ্রকার ‘বিভক্তি’ ও সংকীর্ণতা তৈরি হয়েছে।

তবে এ অন্ধকার চিত্রের মাঝেও কিছু আশার আলো রয়েছে। বড় মূল্যের শিল্পকর্মে বিক্রি কমলেও ছোট মূল্যের (৫০ হাজার ডলারের নিচে) শিল্পকর্মের বিক্রি কিছুটা বেড়েছে। নিলামঘরগুলোর আয় কমেছে ২০ শতাংশ, তবে বিক্রির পরিমাণে কমেছে মাত্র ৪ শতাংশ, যা ইঙ্গিত করে-বেশি সংখ্যক ছোট লেনদেন হচ্ছে। একই প্রবণতা গ্যালারিগুলোর ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। যেসব ডিলারের বার্ষিক টার্নওভার ২ লাখ ৫০ হাজার ডলারের নিচে, তাদের বিক্রি বেড়েছে ১৭ শতাংশ। অন্যদিকে ১ কোটি ডলারের বেশি টার্নওভারযুক্ত প্রতিষ্ঠানের বিক্রি কমেছে ৯ শতাংশ। এর অর্থ-বাজারে ভারসাম্যপূর্ণ ও অপেক্ষাকৃত গণতান্ত্রিক এক ধারা জন্ম নিচ্ছে, যেখানে বড় প্রতিষ্ঠানের প্রভাব কিছুটা হলেও হ্রাস পাচ্ছে।

পরিবর্তনশীল সংগ্রাহক শ্রেণী ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
প্রতিবেদনটিতে উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক-ধনকুবেরদের সম্পদ বেড়ে গেলেও তারা শিল্পকর্ম কেনার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। বরং তরুণ সংগ্রাহকদের মধ্যে চিত্রকর্ম কেনার প্রবণতা হ্রাস পাচ্ছে। অনেকেই এখন আধুনিক এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী শিল্পেই নির্ভরতা গড়ে তুলেছেন। কিন্তু এই সংগ্রাহকদের বয়স এখন ৬০ থেকে ৭০ বছর। ফলে আগামী দশকে শিল্পবাজারে এক বড় শূন্যতা তৈরি হতে পারে। এক ডিলার বলেন, “এখন অনেক ধনী মানুষ আছে যাদের শিল্পকর্ম কেনার অভিজ্ঞতা নেই। বিদ্যমান সংগ্রাহকদের ওপর নির্ভর না করে এই নতুন সম্ভাব্য শ্রেণীর কাছে কীভাবে পৌঁছানো যাবে, সেটাই বড় চ্যালেঞ্জ।”

সব নেতিবাচকতার মধ্যেও একটি ইতিবাচক দিক হলো নারী শিল্পীদের নতুন কাজ বাজারে আগ্রহের সঙ্গে গ্রহণ করা হচ্ছে ।ম্যাকঅ্যান্ড্রর মতে, এটি “উৎসাহব্যঞ্জক প্রবণতা”। বাজারে বৈচিত্র্য আনতে নারী শিল্পীদের এ উত্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শিল্পবাজারের ওঠানামা নতুন কিছু নয়। তবে বিগত এক দশকে বাজার ২০১৪ সালের শীর্ষ বিক্রির সীমা অতিক্রম করতে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি শিল্প ও প্রাচীন সামগ্রীর বাজারে এক নতুন বাস্তবতা সৃষ্টি করেছে, যেখানে শুধু মূল্য নয়, মানসিকতা, সংগ্রাহকদের ধরণ এবং বাজার কৌশল নিয়েও ভাবতে হচ্ছে।

অতএব শিল্পবাজার এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এখান থেকে নতুন কোনো রেনেসাঁর সূচনা হবে নাকি ধীরে ধীরে আরও সংকোচন ঘটবে-তা সময়ই বলে দেবে। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, শিল্পবাজারের ভবিষ্যৎ গঠনে নতুন সংগ্রাহক শ্রেণী, উদীয়মান শিল্পী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।




LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন