দ্বিগুণ হারে উষ্ণ হচ্ছে এশিয়া, বাড়বে চরম আবহাওয়ার ঘটনা

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) প্রকাশিত “State of the Climate in Asia 2024” রিপোর্টে এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে যে, এশিয়া মহাদেশ বৈশ্বিক গড় হারের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ গতিতে উষ্ণ হয়ে উঠছে। এই প্রবণতা কেবল তাপমাত্রার পরিসংখ্যান নয়, মানুষের জীবন, কৃষি, অর্থনীতি এবং সম্পদের টিকে থাকার লড়াইয়ের চিত্র।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সাল পর্যন্ত এশিয়ার তাপমাত্রা পূর্ব-শিল্পযুগীয় গড়ের চেয়ে ১.৮৬°C বেশি ছিল, যা বিশ্বের অন্য যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে বেশি। এটি সরাসরি মানব-সৃষ্ট গ্রীনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ফল, যেখানে কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং মিথেনের ঘনত্ব সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সমুদ্রের পৃষ্ঠদেশেও গড় তাপমাত্রা বেড়েছে, যার ফলে উষ্ণ জলরাশিতে ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে।

২০২৪ সালে ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, এবং খরার ঘটনাগুলো চরমভাবে বেড়ে গেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তানে একদিকে অতিবৃষ্টি ও বন্যা হয়েছে, অন্যদিকে অনেক অঞ্চলে মারাত্মক খরা দেখা দিয়েছে। শুধু বাংলাদেশেই “ঘূর্ণিঝড় রেমাল”-এর আঘাতে ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে, অনেক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং কৃষি জমি লবণাক্ততায় আক্রান্ত হয়েছে। চীনের পূর্বাঞ্চলে, জুন মাসে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে এক মাসের সমপরিমাণ বৃষ্টি হওয়ায় নদী প্লাবিত হয়েছে। অন্যদিকে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে তীব্র খরার কারণে গম ও তুলা চাষে মারাত্মক ধস নেমেছে।

খরা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে কৃষকরা পূর্বানুমানভিত্তিক চাষাবাদ করতে পারছেন না। বাংলাদেশে ধানের মৌসুমে দেরিতে বৃষ্টি এবং পরে অতিবৃষ্টির কারণে ফলনে ১৫–২০% পর্যন্ত ক্ষতি হয়েছে। পাকিস্তানের সিন্ধু এবং ভারতের মহারাষ্ট্র অঞ্চলে কৃষকরা জলাধার শুকিয়ে যাওয়ায় সেচের অভাবে জমি পতিত রেখেছেন।

ডব্লিউএমও রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রথমার্ধেই এশিয়ায় ১০০০-এর বেশি প্রাণহানি হয়েছে চরম আবহাওয়ার কারণে। এছাড়া লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। শহরাঞ্চলে তাপপ্রবাহের কারণে বৃদ্ধ, শিশু ও অসুস্থদের মধ্যে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা এবং শ্বাসজনিত রোগ বেড়েছে। ঢাকায় মে মাসে গড় তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি ছাড়িয়েছে, যা বিগত দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।

WMO অনুমান করছে, শুধু ২০২৪ সালেই চরম আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এশিয়ায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতি কেবল অবকাঠামোতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ক্ষুদ্র চাষি, নিম্নআয়ের মানুষ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনধারায় দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলছে।

এই রিপোর্ট আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জলবায়ু পরিবর্তন কোনো ভবিষ্যতের বিষয় নয় এটি এখনই ঘটছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার, দূষণ কমানো, জলবায়ু অভিযোজন-ভিত্তিক কৃষি নীতি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আজ জরুরি প্রয়োজন। WMO একে একটি “জাগরণের ডাক” হিসেবে উল্লেখ করেছে, যেখানে এশিয়ার দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গ্রহণ করতে হবে—না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও বিপজ্জনক পৃথিবীর মুখোমুখি হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন