গণপিটুনি ও সহিংসতা বন্ধ করতে হবে এখনই। রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়িত্ব নিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে শান্তি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়।
গত নয় মাসে বাংলাদেশের সমাজে গণপিটুনি ও জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। একের পর এক ঘটনা আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা তুলে ধরেছে, রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব সহিংসতা ঠেকাতে কার্যত ব্যর্থ।বারবার দেখা যাচ্ছে, জনতা যখন আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে, তখন পুলিশ ও প্রশাসন নীরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়া, নারী নির্যাতন, জনসমক্ষে মানুষকে মারধর, ধর্মীয় উপাসনালয় ভাঙচুরসহ নানা ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবারই রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং অনেক সময় দেখা গেছে, প্রশাসনের নীরবতা জনতাকে আরও বেশি সাহসী করে তুলেছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, এসব সহিংসতার পেছনে রাজনৈতিক দলগুলোর স্থানীয় কর্মী-সমর্থকদেরও জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। অথচ দলীয় নেতৃত্ব শুধু বিবৃতি দিয়ে দায় সারে “আমরা সহিংসতা সমর্থন করি না”, কিংবা “দোষী সাব্যস্ত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে” কিন্তু বাস্তবে কোনো কঠোর ব্যবস্থা দেখা যায় না।
এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সঠিক সময়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। অনেক সময় ঘটনা ঘটার পর, ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে, তখনই কেবল সরকার বা প্রশাসন মুখ খোলে। প্রশ্ন ওঠে আইন কি কেবল তখনই কার্যকর হয়, যখন তা ফেসবুকে ভাইরাল হয়? নাকি নীরব দর্শক হয়ে থাকা সরকারের নতুন নীতি?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা আছে, “কোনো ব্যক্তিকে নির্যাতন, নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অপমানজনক শাস্তি দেওয়া যাবে না।” অথচ গত কয়েক মাসে একের পর এক ঘটনা দেখিয়েছে, এই সাংবিধানিক অধিকার বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গণপিটুনি বা জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়া কোনোভাবেই সভ্য সমাজের চিহ্ন নয়। এতে বিচারবহির্ভূত শাস্তি, নিরীহ মানুষের হয়রানি, এবং সামগ্রিকভাবে সমাজে ভয়ের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্লিপ্ততা কিংবা রাজনৈতিক দলগুলোর নীরবতা এই সমস্যাকে আরও গভীর করছে।
বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা ও কার্যকর পদক্ষেপ। শুধু বিবৃতি নয়, দোষীদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। প্রশাসনকে নিরপেক্ষ ও সক্রিয় হতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। সবশেষে বলা যায়, গণপিটুনির এই সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে, সমাজে ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এখনই সময়, রাষ্ট্র ও সমাজকে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে এই সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।


