বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাস্তুচ্যুতির হার দিন দিন বাড়ছে। নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দুর্যোগের কারণে লাখো মানুষ তাদের ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যত্র অভিবাসন নিতে বাধ্য হচ্ছে। ১৯৮৮ সালে বরিশালের উজিরপুরের বেলায়েত হোসেনের মতো অনেকেই বন্যায় ঘরবাড়ি হারিয়ে বাগেরহাটের মোংলায় স্থানান্তরিত হয়েছেন। তিন দশক উদ্বাস্তুর জীবনযাপনের পর ২০১৯ সালে সরকারি আবাসন প্রকল্পে তিনি ৫০০ বর্গফুটের একটি টিনের ঘর পেয়েছেন, যেখানে তাঁর পাঁচ সদস্যের পরিবার কোনোমতে বসবাস করছে।
অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের (আইডিএমসি) তথ্য অনুযায়ী প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশের বর্তমান বার্ষিক বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা ৯ লাখ ১৫ হাজার। যেটি শতকের শুরুতে ছিল গড়ে সাত লাখ। ২০২৪ সালে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির শীর্ষে থাকা দেশের তালিকায় বাংলাদেশের স্থান বিশ্বে পঞ্চম। সংখ্যাটা হচ্ছে ১৭ লাখ ৯১ হাজার। ২০০৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত মোট ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ দুর্যোগের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২১ সালে প্রকাশিত ‘গ্রাউন্ডসওয়েল’ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসীর সংখ্যা দক্ষিণ এশিয়ার মোট অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসীর প্রায় অর্ধেক হয়ে উঠতে পারে, যেটি সংখ্যার বিচারে দাঁড়ায় ১ কোটি ৯৯ লাখ।
জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত আন্তসরকারি প্যানেলের (আইপিসিসি) ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী ২১০০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ০.৪৮ থেকে ২ মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশের উপকূলীয় ১৯টি জেলা পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যার ফলে কেবল সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণেই এসব অঞ্চলের ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে।আইডিএমসির তথ্য অনুসারে উপকূলীয় জেলা যেমন ভোলা, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, সাতক্ষীরার মতো জেলাগুলো থেকে বাস্তুচ্যুতি বেশি ঘটে। প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের বছরগুলোতে বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা বেড়ে যায়। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের ফলে ২৫ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল।
রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) ২০১৮ সালের গবেষণা অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যারা অভিবাসন নিচ্ছে, তাদের প্রায় ৬০ শতাংশ রাজধানী ঢাকা, ২০ শতাংশ চট্টগ্রাম শহরে ও ২০ শতাংশ আন্তজেলায় অভিবাসী হচ্ছে। মেয়রস মাইগ্রেশন কাউন্সিলের ২০২১ সালের প্রতিবেদন অনুসারে দেশের উপকূলীয় নিম্নভূমি থেকে প্রতিদিন দুই হাজার মানুষ রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরিত হচ্ছে। প্রতিবছর ঢাকায় চার লাখের মতো নিম্ন আয়ের অভিবাসী আসে যারা রাজধানীর বিভিন্ন বস্তিতে বসবাস করছে। এর একটি উদাহরণ হল ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত ভোলার মানুষদের নিয়ে গড়ে ওঠা “ভোলা বস্তি”। রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী এলাকায় ওয়াসা ও গৃহায়ণ অধিদপ্তরের জমিতে গড়ে উঠেছিল এই বস্তি। পুরানো বাসিন্দাদের অনেকেই এখন উচ্ছেদের ভয়ে ভুগছেন।
গবেষকরা বলছেন অভিবাসনের ফলে তিন শ্রেণির মানুষ বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়ে, অভিবাসী নিজে, অভিবাসন এলাকায় থেকে যাওয়া মানুষ, এবং যে এলাকায় অভিবাসন ঘটে সেই এলাকার মানুষ। এর ফলে খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে এবং দারিদ্র্যের হার আরও বেড়ে যায়।দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ আবদুল লতিফ খান বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ আসলে সহিষ্ণু (রেজিলিয়েন্ট)। তারা যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারে। কিন্তু এটি স্রেফ মানিয়ে নেওয়া। তারা মানবেতর জীবন যাপন করলেও টিকে আছে। এ টিকে থাকা মানুষদের সহায়তা করতে হলে পরিসংখ্যানের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।”
রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, “বাংলাদেশের বাস্তুচ্যুতির সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত না থাকায় জাতিসংঘের জলবায়ু তহবিল বা জলবায়ু ক্ষতিপূরণে গঠিত অন্য আন্তর্জাতিক তহবিলের কোথাও সাহায্যের আবেদন করা যায় না। কারণ সংস্থাগুলো বাস্তুচ্যুতির সুনির্দিষ্ট তথ্য চায় এবং সেটাই স্বাভাবিক।” সুতরাং জলবায়ু বাস্তুচ্যুতি মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান ও পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।


