দেশের সীমান্তের ওপারে যা ঘটছে তার অন্য একটা তাৎপর্য আছে। এটি শুধু বাংলাদেশের মামলা না, এটা তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অংশও, বিশেষ করে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির। বিষয়টা কেমন? ভারতের গদি মিডিয়ার প্রতিক্রিয়া নিয়ে আমরা যে এখানে হাসাহাসি করি, সেটা তারা বুঝেও, জেনেও এই কাজটা দিনের পর দিন করে যাইতেছে। তারা যে প্রপাগান্ডাগুলা করে যাইতেছে সেটি মূলত ইচ্ছা করেই। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশ ইস্যুকে ব্যবহার করে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি চাঙ্গা করতেই ওঠেপড়ে নেমেছে তারা। টার্গেট পশ্চিমবঙ্গের আগামী বিধানসভা নির্বাচন। সেইসঙ্গে লোকসভা নির্বাচনে হারানো ভোটব্যাংক পুনরায় ফেরত আনা।
মমতাও সেটি বুঝতে দেরি করছেন, নাকি নিজের কৌশল কীভাবে সাজাবেন সেটি পরিকল্পনা করতেছিলেন, নাকি সময়ের জন্য অপেক্ষা করতেছিলেন তা বলতে পারব না। তবে আজকে বাংলাদেশে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী পাঠানোর আবেদনের মধ্যে স্পষ্ট হইল, তিনি এখন আসলে হিন্দুত্ববাদী বিজেপির চেয়েও আরও কড়া হিন্দুত্ববাদী কৌশলে খেলতে চাইতেছেন। আবার তার মুসলিম ভোটাররা যেন না চটে সেইটাও খেয়াল রাখতে হইতেছে তাকে। এ জন্য তিনি জাতিসংঘের পথ ধরছেন।
আমার মনে হয়, গদি মিডিয়ার মাধ্যমে প্রোপাগান্ডা চালিয়ে বাংলাদেশ ইস্যুতে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী অবস্থান, বিভিন্ন কর্মসূচি, সীমান্তে সমাবেশ এগুলা নিয়মিত অনিয়মিতভাবে চালিয়ে যাবে। আজকে বা এর আগে হাইকমিশন অফিসে হামলা তারই অংশ। পশ্চিমবঙ্গ বা ত্রিপুরা বাংলাদেশঘেঁষা অঞ্চলগুলোতে বিজেপি পূর্ণমাত্রায় তার অবস্থান তৈরি করতে এভাবেই হাঁটবে এখন। মমতারে ঘায়েল করার এখন এটাই তার জন্য সবচেয়ে লেটেস্ট ও উত্তম অস্ত্র। মমতাও একই অস্ত্র নিয়ে খেলার জন্য প্রস্তুত সেটি তো বোঝাই গেল।
ফলে এসবের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশে হবে, ভারতের পতাকার ওপর হেঁটে যাওয়া ইত্যাদি ঘটতে থাকবে। ভারতের পণ্য বয়কটের কর্মসূচিও হয়তো আবার জোরালো হবে। এই মুহুর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে জরুরি ভারতের সঙ্গে পিপল টু পিপল সম্পর্ক চাঙ্গা করা। কলকাতা থেকে দিল্লি অনেকেই আছেন, বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের বাড়াবাড়ি আচরণ পছন্দ করেন না। শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেয়ার বিষয়টিও অনেকে সমালোচনা করেন। আর জুলাই অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের পক্ষে মানে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংহতি জানিয়ে মিছিলও হয়েছে। তাদের সঙ্গে কানেকশনগুলো আমাদের বাড়াতে হবে।
তাদের দিক থেকেই আওয়াজ ওঠাতে হবে বাংলাদেশ ইস্যুতে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী প্রচারণার বিরুদ্ধে। বিজেপির হিন্দুত্ববাদী অবস্থান বা শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেয়ার কারণে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে প্রবল ভারতবিরোধিতা বাড়ছে, সেটির উদ্বেগ তাদের দিক থেকেই আসবে তখন।
পিপল টু পিপল কানেকশনে আমি মনে করি সেটি সম্ভব। ভারতেও প্রতিনিয়ত সংখ্যালঘু নির্যাতন হইতেছে, মনিপুরসহ সেভেন সিস্টার্সের অন্যান্য রাজ্যে নানা ঘটনা ঘটতেছে, মূলত হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির শিকার হইতেছেন সে দেশের অনেক এলাকার মানুষজন, তাদের সঙ্গে আমাদের আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলা চাই।
শত্রুতা নয়, দুই দেশের মানুষের মধ্যে মিত্রতা গড়ে তুলতে হবে। সেক্ষেত্রে পতাকা মাড়ানো এগুলো নিচু লেভেলের কর্মসূচি। তাদের প্রতিক্রিয়ায় এখানেও ভারতের হাইকমিশন ঘেরাও কর্মসূচিও যুক্তিযুক্ত হবে না, এতে বরং আগুনে ঘি ঢালা হবে। যুদ্ধংদেহী আচরণ দেখিয়ে আদতে ফায়দা নাই।
গদি মিডিয়া বাংলাদেশ নিয়ে যে অপপ্রচার চালাইতেছে প্রতিনিয়ত, তার কাউন্টার দেয়ার জন্য সরকারের একটা সেল তৈরি করা এখন খুব জরুরি। আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যে ভারতনির্ভরতা কমাইতে হবে। ভারতের সঙ্গে চুক্তিগুলো প্রকাশ করে কোনটা বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী তা চিহ্নিত করে সেগুলা থেকে সরে আসার পথ খুঁজতে হবে। আন্তর্জাতিক নদী আইনে আমাদের স্বাক্ষর করতে হবে। এমন অনেক কিছুই আছে করার।


