দেশি মূল্যস্ফীতি কেন বাড়লো , কমছে না কেন ?

বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ শতাংশের ওপরে, যদিও সম্প্রতি কিছুটা কমেছে। দুই বছরের বেশি সময় ধরে দেশে এই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এত দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষ হিমশিম খাচ্ছে। ব্যাহত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনা।

করোনার প্রথম ধাক্কার পর ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময় থেকেই মূল্যস্ফীতির হার সারা বিশ্বে বাড়তে শুরু করে। এরপর ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে পরিস্থিতির গুরুতর অবনতি হয়। ইউরোপ ও আমেরিকায় মূল্যস্ফীতির হার ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে চলে যায়। তখন থেকে বাংলাদেশেও মূল্যস্ফীতি বাড়তে শুরু করে।

কিন্তু উপমহাদেশের অন্যান্য দেশ বা ইউরোপ-আমেরিকা মূল্যস্ফীতির হার কমিয়ে আনতে পারলেও বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির হার এখনো যথেষ্ট কমছে না। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, নীতিগত ভুলের কারণে দেশে মূল্যস্ফীতি কমছে না।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রধান হাতিয়ার হলো মানুষের চাহিদার রাশ টেনে ধরা। এর স্বীকৃত মাধ্যম হলো নীতি সুদহার বাড়ানো। বিশ্বের সব দেশেই এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত সুদহার কৃত্রিমভাবে কমিয়ে রাখে, তত দিনে মূল্যস্ফীতি ৭ থেকে ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এরপর ধাপে ধাপে নীতি সুদহার বাড়ানো হলেও তা ছিল সীমিত। ফলে বাস্তব সুদহার ছিল (মূল্যস্ফীতি বাদ দিলে) ঋণাত্মক।

এ কারণে বেশি ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি আরও উসকে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। আবার এটাও ঠিক, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি চাহিদাভিত্তিক নয়; এর সঙ্গে রাজস্ব নীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনার সংযোগ আছে।

আরেকটি বিষয় হলো টাকার মান কৃত্রিমভাবে ধরে রাখা। ২০২২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘদিন ডলারের মান ছিল ৮৬ টাকা, যদিও রপ্তানিকারকেরা দীর্ঘদিন ধরে টাকার অবমূল্যায়নের কথা বলে আসছিলেন। কিন্তু শেষমেশ টাকার বিনিময় হার বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা হয় ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়।

কিন্তু ডলার-সংকটের কারণে কালোবাজারে ডলারের দাম সরকারি হারের চেয়ে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেশি হয়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে সরকার আমদানি সীমিত করে। ফলে অনেক পণ্যের আমদানি বিঘ্নিত হয় এবং পরিণামে পণ্যের দাম আরও বেড়ে যায়। সেই যে মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেল, তারপর বাংলাদেশ সরকার এখন পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো, ভর্তুকি কমানো বা রাজস্ব আদায় বাড়ানোর ব্যর্থতা। জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৈশ্বিক দামের সঙ্গে যথাসময়ে সমন্বয় করা হয়নি। ফলে বাজেটের ওপর চাপ পড়ে। সরকার জনপ্রিয়তা হারানোর ভয়ে আয়কর বা প্রত্যক্ষ কর সংস্কারে উদ্যোগ নেয়নি। এতে বাজেট–ঘাটতি বেড়েছে। এই ঘাটতির কিছু অংশ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পূরণ করা হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে মূল্যস্ফীতিতে।

বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি দেয়। কিন্তু সেই ভর্তুকির লক্ষ্যভিত্তিক বণ্টন দুর্বল। জ্বালানি, সার ও খাদ্যপণ্যের ভর্তুকি দরিদ্রদের জন্য যথাযথভাবে বরাদ্দ করা হয়নি। মধ্যবিত্ত ও ব্যবসায়ীরাও এ সুবিধা পেয়ে যান। ফলে ভর্তুকির কার্যকারিতা কমে যায়। এসব কারণে দরিদ্র ও সীমিত আয়ের মানুষের জীবনে মূল্যস্ফীতির প্রভাব আরও বেড়ে যায়।

মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ হলো বাজার তদারকি ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা। পেঁয়াজ, চিনি, চালসহ মূল নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে সিন্ডিকেট সক্রিয় আছে, যারা কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ায়। সরকারের বাজার তদারকির ব্যবস্থা দুর্বল ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত। ফলে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।

মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা অপ্রতুল। উন্নত দেশের সরকার যেভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময় মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে, বাংলাদেশ সেভাবে পারে না। এর মূল কারণ, অপ্রতুল রাজস্ব আয়।

মূল্যস্ফীতির প্রভাব মোকাবিলায় একমাত্র প্রত্যক্ষ কর্মসূচি টিসিবির মাধ্যমে পণ্য বিক্রি। সেই সঙ্গে আছে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা কর্মসূচি; যদিও তা ঠিক সরাসরি মূল্যস্ফীতির কারণে দেওয়া হয় না। সেটাও আবার পরিমাণ ও পরিসরে অনেক ছোট। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বড় অংশ এর আওতার বাইরে থেকে যায়। পাকিস্তানের বিআইএসপি বা ভারতের বিনা মূল্যে খাদ্য কর্মসূচির মতো সর্বজনীন বা ব্যাপকভিত্তিক সহায়তা কর্মসূচি বাংলাদেশে অনুপস্থিত।

দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার আরেকটি কারণ হলো তথ্যের বিকৃতি ও নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাব। অভিযোগ আছে, মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান (বিশেষ করে খাদ্য ও বাসাভাড়া) বাস্তবতা থেকে কম দেখানো হয়। এসব কারণে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়েছে। নীতিনির্ধারকদের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও সাধারণ নাগরিকদের। এ কারণে মূল্যস্ফীতি নিয়ে শঙ্কা আরও বেড়েছে।

বাংলাদেশ যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে, তখন অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা উল্লেখযোগ্য হারে মূল্যস্ফীতি কমাতে পেরেছে। অথচ শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের মূল্যস্ফীতির হার ছিল বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি।

বাংলাদেশ, শ্রীলংকা ও পাকিস্তান — এই তিন দেশের মধ্যে তুলনামূলক পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ প্রতিটি ক্ষেত্রেই পিছিয়ে। প্রথমত, নীতি সুদহার বাড়াতে বিলম্ব করা; দ্বিতীয়ত, মুদ্রার বিনিময় হার ভাসমান বা বাজারভিত্তিক করতে অনেক দেরি করা; তৃতীয়ত, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করতে না পারা ও চতুর্থত, নিম্ন আয় ও দরিদ্র মানুষের জন্য বিশেষায়িত কর্মসূচি গ্রহণ না করা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন