বিজ্ঞানীরা বলছেন পাথরকে অসাধারণ কিছুতে রূপান্তর করার উপায় খুঁজে পেয়েছেন। এটি উচ্চ- প্রযুক্তির কম খরচের পদার্থ, যা ভূতাত্ত্বিক সময়কে বাঁকাতে পারে এবং গ্রহের উষ্ণায়নকে থামাতে, এমনকি উল্টে দিতেও সাহায্য করতে পারে। দেখতে একেবারেই সাধারণ ধূসর, কিছুটা সবুজ আভাযুক্ত এমন পাথর যা হয়তো আমারা খেয়াল না করেই পার হয়ে যাই। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন যে, সিমেন্ট তৈরির জন্য ব্যবহৃত কিছু প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে তারা সাধারণ খনিজ পদার্থের একটি মিশ্রণ উত্তপ্ত করে এমন একটি উপাদানে পরিণত করার উপায় পেয়েছেন, যা বাতাস থেকে কার্বন শোষণ করে এবং তা গভীর সমুদ্রে জমা রাখতে সক্ষম।
গবেষণাপত্রটির প্রধান লেখক স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নবিদ ম্যাট কানান বলেছেন “এটা সেই বস্তু, যার উপর আমরা প্রতিদিন হাঁটি,” গবেষণাপত্রটি বুধবার Nature জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে বর্ণনা করা হয়েছে কীভাবে পাথরকে এই ধরনের উপাদানে রূপান্তরিত করা সম্ভব। আমাদের চারপাশের কঠিন পাথর কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করতে পারে। যখন বৃষ্টি এমন ভূমিতে আঘাত করে যেখানে নির্দিষ্ট খনিজ পদার্থের মিশ্রণ থাকে তখন বাতাসের কার্বন ডাই অক্সাইড পানির সাথে মিশে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন যৌগ তৈরি করে যা এই গ্যাসকে বন্দি রাখতে পারে। যথেষ্ট সময় পেলে এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটি বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড দূর করতে পারে যেটি মূলত জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে নির্গত হয়।
কিন্তু সমস্যা হলো এই প্রাকৃতিক চক্রটি কয়েক হাজার বছর বা তারও বেশি সময় ধরে চলে। কানানের ধারণা হলো এই প্রক্রিয়াটি যা সাধারণত ভূতাত্ত্বিক সময়সীমায় ঘটে সেটিকে দ্রুততর করা। কাজটি করার জন্য তার গবেষক দল চুনাপাথরের সাথে ম্যাগনেশিয়ামযুক্ত এক ধরনের সিলিকেট খনিজ মিশ্রিত করেছেন। যেমন অলিভাইন, যা বিশ্বজুড়ে পাওয়া যায়। যখন এই মিশ্রণকে উচ্চ তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয়, তখন চুনাপাথরের ক্যালসিয়াম ও সিলিকেটের ম্যাগনেশিয়াম একে অপরের সাথে অবস্থান বদল করে। অনেকটা নাচের সময় সঙ্গী বদলানোর মতো।
এই রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে দুটি যৌগ তৈরি হয়, ম্যাগনেশিয়াম অক্সাইড ও ক্যালসিয়াম সিলিকেট। যা উন্মুক্ত বাতাস ও পানির সংস্পর্শে এসে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কার্বন ডাই অক্সাইড বন্দি করতে পারে। গবেষকরা হিসাব করেছেন এই প্রক্রিয়ার জন্য চুল্লি উত্তপ্ত করতে ও চুনাপাথর পোড়ানোর ফলে নির্গত কার্বন ডাই অক্সাইড ধরে রাখার পরও প্রতি টন উপাদান এক টন কার্বন ডাই অক্সাইড বায়ুমণ্ডল থেকে সরাতে সক্ষম। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অ্যাবি লুনস্ট্রম গবেষণাটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না হয়েও বলেছেন এটি “ভূতাত্ত্বিক আবহাওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার গবেষণার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।” তবে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন যখন অশুদ্ধ পাথরের ব্যবহার করা হবে তখন এই প্রযুক্তি কতটা কার্যকর হবে।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পিটার কেলেমন সন্দেহ প্রকাশ করেছেন প্রস্তাবিত প্রক্রিয়াটি অন্য অনুরূপ প্রক্রিয়ার চেয়ে কম শক্তি ব্যবহার করবে কি না। কারণ এতে উচ্চ তাপমাত্রা ও বিশাল পরিমাণ উপাদান প্রয়োজন হবে। “অন্য সহজ পদ্ধতির মতো, যেমন চুনাপাথর উত্তপ্ত করে চুন তৈরি করা, এই প্রক্রিয়ার অর্ধেকেরও বেশি ব্যয় সম্ভবত উত্তপ্ত করার শক্তির জন্য ব্যয় হবে,” বলেছেন কেলেমন যিনি Heirloom Carbon Technologies নামে একটি কোম্পানি চালু করতে সাহায্য করেছেন যা অনুরূপ প্রযুক্তির উপর কাজ করছে।
কানান তার প্রক্রিয়াটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করতে চান। যেখানে পোড়ানো খনিজগুলো কৃষকদের জন্য সার হিসেবে ব্যবহৃত হবে। শেষ পর্যন্ত বন্দি করা কার্বন নদীর মাধ্যমে সমুদ্রে ধুয়ে যাবে এবং সেখানে জমা হবে। তিনি তার রসায়ন জীবনের শুরু করেছিলেন আণবিক জীববিজ্ঞান নিয়ে কাজ করে এবং প্রথমদিকে খনিজ বা পাথরের প্রতি তেমন আগ্রহী ছিলেন না। তিনি বলেন “আমি দীর্ঘদিন ধরে খনিজ ও পাথরকে নিয়ে ঠিক এভাবেই ভেবেছি,”।


