দুঃখ-দুর্দশায় বড় হওয়া শিশুরা , অংকে পিছিয়ে যায় কেন ?

শৈশবের কষ্ট-যেমন দারিদ্র্য, পিতামাতার মানসিক অসুস্থতা, নিরাপদ নয় এমন আশেপাশের পরিবেশ-মস্তিষ্কের হোয়াইট ম্যাটারের ক্ষতি করে এবং মস্তিষ্কের গঠনেও দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনে।

ম্যাসাচুসেটসের ব্রিগহাম অ্যান্ড উইমেন্স হাসপাতালের গবেষণায় দেখা গেছে, ৯,০০০ এর বেশি ৯ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুর মধ্যে যারা এই ধরনের কষ্টের সম্মুখীন হয়েছে, তাদের মস্তিষ্কের হোয়াইট ম্যাটারের সংযোগ ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। হোয়াইট ম্যাটার হলো মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের পথ, যা বিভিন্ন অংশের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, এই হোয়াইট ম্যাটারের সংযোগের হ্রাস শিশুর ভাষা এবং গণিতের দক্ষতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ শৈশবে যে মানসিক চাপ ও কষ্ট হয়, তা মস্তিষ্কের সেই অংশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে যা গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিমত্তা ও শিক্ষাগত কাজের জন্য অপরিহার্য।

গবেষণাটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২১টি কেন্দ্রে পরিচালিত ‘অ্যাডোলেসেন্ট ব্রেন কগনিটিভ ডেভেলপমেন্ট (ABCD)’ স্টাডির অংশ ছিল। এতে শিশু ও তাদের অভিভাবকদের কাছ থেকে বিভিন্ন শৈশবের কষ্টের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল, যেমন গর্ভাবস্থায় ঝুঁকি, পারিবারিক অশান্তি, অর্থনৈতিক সংকট, আশেপাশের পরিবেশের নিরাপত্তাহীনতা এবং সামাজিক সহায়তার মাত্রা। এই তথ্যের সঙ্গে মস্তিষ্কের সাদা পদার্থের এমআরআই স্ক্যান মিলিয়ে দেখা হয়।

গবেষণার প্রধান লেখক সোপিয়া কারোজ্জা বলেন, “আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, হোয়াইট ম্যাটারের পরিবর্তন মস্তিষ্কের এক বা দুইটি নির্দিষ্ট অংশে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পুরো মস্তিষ্কেই ছড়িয়ে আছে। অর্থাৎ শৈশবের কষ্ট মস্তিষ্কের বিস্তৃত অংশকে প্রভাবিত করে।”

তবে আশার কথা হলো, যারা স্থিতিশীল পারিবারিক জীবন ও শক্তিশালী সামাজিক সমর্থন পেয়েছে তারা এই নেতিবাচক প্রভাব থেকে তুলনামূলকভাবে রক্ষা পেয়েছে। অর্থাৎ ভালো অভিভাবকত্ব এবং নিরাপদ পরিবেশ শিশুর মস্তিষ্কের সাদা পদার্থকে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে।

গবেষকরা বলছেন, শৈশবের এই সংকটগুলো মস্তিষ্কের বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ঘটে, যা পরবর্তীতে কিশোরাবস্থা ও প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যকর ও সমর্থনমূলক পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।

এই গবেষণার মাধ্যমে বোঝা যায়, শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে পরিবেশের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। দারিদ্র্য, পারিবারিক অশান্তি, মানসিক অসুস্থতা, নিরাপত্তাহীন আশেপাশের পরিবেশের মতো প্রতিকূলতা শুধুমাত্র শিশুর মানসিক অবস্থাই নয়, তার মস্তিষ্কের কাঠামোতেও পরিবর্তন আনে, যা তার শেখার ক্ষমতা ও বুদ্ধিমত্তাকে প্রভাবিত করে।

শিশুদের মস্তিষ্কের সাদা পদার্থের সংযোগ শক্তিশালী রাখতে এবং তাদের ভবিষ্যত সম্ভাবনা উন্নত করতে পরিবারের পাশাপাশি সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। নিরাপদ, স্নেহময় ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে শিশুদের মস্তিষ্কের সুস্থ বিকাশের মূল চাবিকাঠি।

শৈশবের প্রতিকূলতা থেকে সুরক্ষা এবং মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে বিনিয়োগ করা মানে ভবিষ্যতের প্রজন্মের মেধা ও সম্ভাবনাকে রক্ষা করা। এই গবেষণা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, শিশুরা শুধু ভালো পরিবেশেই বিকশিত হতে পারে, যা তাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সফলতার ভিত্তি গড়ে দেয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন