নারীদের স্বাস্থ্যের উপর দমিয়ে রাখা আবেগ, বিশেষত রাগের প্রভাব, এক গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল বিষয়। ২০২০ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, অটোইমিউন রোগগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশই নারীদের মধ্যে দেখা যায়। ২০২১ সালের আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা উদ্বেগ, PTSD এবং অ্যানোরেক্সিয়ার মতো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় বেশি ভোগেন। শুধু জৈবিক কারণ নয়, আচরণগত ও মনস্তাত্ত্বিক কারণও এতে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে দমন করা রাগ নারীদের স্বাস্থ্যের অবনতির অন্যতম কারণ।
প্রাচীনকাল থেকে সমাজ নারীদের এমনভাবে গড়ে তুলেছে যাতে তারা শান্ত, সংযত ও পরিচর্যাকারী হয়। বিশেষত নারীদের রাগ প্রকাশকে নেতিবাচকভাবে দেখা হয় এবং এটি ‘পুরুষালী’ আচরণ বলে গণ্য করা হয়। কিন্তু রাগ একটি স্বাভাবিক মানবিক আবেগ, যা দমন করা হলে মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।
মনোবিজ্ঞানী ডানা জ্যাক ১৯৮০-এর দশকের শেষের দিকে নারীদের মধ্যে একটি সাধারণ প্রবণতা লক্ষ্য করেন- ‘স্ব-নীরবতা’ বা নিজেদের চাহিদা দমন করা, অন্যকে খুশি রাখতে নিজেকে উপেক্ষা করা এবং সংঘর্ষ এড়িয়ে চলা। তার গবেষণায় দেখা যায়, এই আচরণ বিষণ্ণতার ঝুঁকি বাড়ায়। সাম্প্রতিক এক গবেষণায়, পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় দেখায় যে, কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের মধ্যে দমন করা রাগ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, যা হৃদরোগের জন্য একটি প্রধান কারণ।
৩৭ বছর বয়সী লন্ডনের বাসিন্দা সারার পেরনিশিয়াস অ্যানিমিয়া ও ফাইব্রোমায়ালজিয়া ধরা পড়ে। তার মতে, তার অসুস্থতার পেছনে এক বড় কারণ ছিল তার অনুভূতিগুলো অবদমন করা। তিনি বলেন, ‘আমি সবসময় অনুভব করতাম যে কেউ আমার কথা শুনছে না। যত বেশি সঙ্গের জন্য লড়েছি, তত কম পেয়েছি, যা আমাকে চুপ হয়ে যেতে বাধ্য করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার বন্ধু, পরিবার, সমাজ-সব কিছুর প্রতি ক্ষোভ ছিল, কিন্তু সেই রাগ কোথাও প্রকাশ করতে পারিনি। তাই সেটি গলা, বুক, পেট ও কাঁধে ব্যথার মাধ্যমে আমার শরীরে জমে গেছে। আমি বুঝতে পারলাম, এটি জমে থাকা আবেগের শারীরিক বহিঃপ্রকাশ। মুক্তির জন্য আমি ইকস্ট্যাটিক ডান্স, ম্যাসাজ, গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, দেহ-স্ক্যানিং ও গ্রাউন্ডিং টেকনিক ব্যবহার শুরু করি।’
এন্ডোক্রিনোলজিস্ট ডা. জোলিন ব্রাইটেন ব্যাখ্যা করেন, ‘আবেগ দমন, বিশেষ করে রাগ, দীর্ঘমেয়াদী মানসিক চাপ, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভারসাম্যহীনতা এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের সঙ্গে যুক্ত।’ গবেষণায় দেখা গেছে, আবেগ দমন করলে হাইপোথ্যালামাস-পিটুইটারি-অ্যাড্রেনাল (HPA) অক্ষের দীর্ঘমেয়াদী সক্রিয়তা হতে পারে, যা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যাহত করে।
স্বাস্থ্য মনোবিজ্ঞানী ও CBT থেরাপিস্ট ডা. সুলা উইন্ডগাসেন বলেন, ‘স্বাস্থ্য মূলত জৈবিক, মানসিক ও সামাজিক-এই তিনটি উপাদানের সংমিশ্রণ। যদি আমরা শারীরিক অসুস্থতার কারণ বুঝতে চাই, তাহলে আমাদের মানসিক ও সামাজিক প্রভাবগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।’ নারীরা কীভাবে দমন করা আবেগের নেতিবাচক প্রভাব থেকে মুক্তি পেতে পারেন? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাগ বা অন্য আবেগ চেপে রাখার বদলে তা সুস্থ উপায়ে প্রকাশ করা জরুরি।
কিছু কার্যকর উপায় হলো: ডায়েরি লেখা, নিজের আবেগ বোঝা ও প্রকাশের একটি নিরাপদ মাধ্যম। শরীরচর্চা ও যোগব্যায়াম শরীরের সঞ্চিত চাপ ও দমন করা আবেগকে মুক্ত করতে সহায়তা করে। সম্পর্ক ও পেশাগত জীবনে সুস্থ যোগাযোগ ও ব্যক্তিগত সীমারেখা তৈরি করা। সাথে মাইন্ডফুলনেস ও শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে ও মানসিক চাপ কমায়।
নারীদের রাগ প্রকাশের অধিকার ও প্রয়োজনীয়তা সমাজ দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষা করে এসেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা ও অভিজ্ঞতাগুলো দেখাচ্ছে, দমিয়ে রাখা/চেপে রাখা রাগ শুধু মানসিক নয়, শারীরিক স্বাস্থ্যেও গুরুতর প্রভাব ফেলে। সঠিক উপায়ে রাগ প্রকাশ করতে শিখলে নারীরা শুধু মানসিক শান্তিই পাবেন না, বরং দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক সুস্থতাও নিশ্চিত করতে পারবেন।


