বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের পথে এগিয়ে গেলেও দক্ষ মানবসম্পদের অভাব ও সুসংগঠিত শিক্ষানীতির অনুপস্থিতি এ গতিকে ব্যাহত করছে। টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য জনসংখ্যাকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে এটি এখনো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। দেশের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কর্মী প্রস্তুত করা হচ্ছে না, ফলে তরুণরা উচ্চশিক্ষার দিকে ঝুঁকলেও তা অনেক ক্ষেত্রেই শ্রমবাজারের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী উচ্চশিক্ষিত বেকারের হার কম শিক্ষিতদের তুলনায় বেশি, যা শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তবমুখিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। অন্যদিকে, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও কারিগরি শিক্ষার অভাবে শিল্প, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও সেবা খাত কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারছে না।
প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলেও তাদের অধিকাংশই অদক্ষ বা স্বল্প দক্ষ শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মীদের উচ্চ মজুরি ও উন্নত সুযোগ-সুবিধা থাকলেও আমাদের শ্রমশক্তির বড় অংশ সেই প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। দক্ষ কর্মীদের আয় স্বল্প দক্ষদের তুলনায় প্রায় দুই-তিন গুণ বেশি, যা প্রমাণ করে যে পরিকল্পিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রেমিট্যান্স বহুগুণে বাড়ানো সম্ভব। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোতে প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ফিলিপাইন নার্সিং, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে অধিকাংশ শ্রমিক কম মজুরির শ্রমে নিযুক্ত থাকেন, যা তাদের আর্থিক উন্নতির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এই সংকট উত্তরণে পরিকল্পিত শিক্ষা ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা জরুরি। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি শিক্ষা, ভাষা শিক্ষা ও ডিজিটাল দক্ষতার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া প্রয়োজন। দক্ষ কর্মীরা কেবল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে না, বরং তাদের জীবনমানও উন্নত হবে, যা দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে ।শিক্ষানবিশ(ইন্টার্নশিপ) শিক্ষার্থীদের কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে। উন্নত দেশগুলোয় শিক্ষানবিশি বাধ্যতামূলক হওয়ায় শিক্ষার্থীরা চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকে। বাংলাদেশেও শিক্ষানবিশি ব্যবস্থা চালু করা গেলে তরুণরা বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে এবং দ্রুত কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি প্রধান দুর্বলতা হলো এটি তাত্ত্বিক শিক্ষার ওপর বেশি নির্ভরশীল, যেখানে অর্জিত জ্ঞানের ব্যবহারিক প্রয়োগের সুযোগ সীমিত। এর ফলে শিক্ষার্থীরা চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। কারিগরি ও পেশাভিত্তিক শিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষানবিশি বাধ্যতামূলক করা গেলে শিল্প ও সেবা খাতে দ্রুত প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। শিল্প ও বাণিজ্যের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিবিড় সংযোগ গড়ে তুলতে পারলে জনশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা সহজ হবে। শিল্প খাতে দক্ষ জনবল তৈরির জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি অংশীদারত্ব গড়ে তোলা জরুরি। উন্নত বিশ্বে ডুয়াল এডুকেশন সিস্টেম চালু রয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা একযোগে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের সুযোগ পায়। বাংলাদেশেও এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে এবং শিল্প খাত দক্ষ কর্মী পাবে।
এক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে, যা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের জন্য উপযোগী কর্মী তৈরি করবে। এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগে কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হলে শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়ন সম্ভব হবে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে উদ্যোক্তা উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। নতুন উদ্যোক্তাদের সহায়তার জন্য স্টার্টআপ ইনকিউবেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে, যা তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে।


