দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্রে সামরিক বাহিনীর প্রভাব যেন আবার ঘনীভূত হচ্ছে। নব্বইয়ের দশকে যখন গণতন্ত্রের তৃতীয় ঢেউ এ অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে, তখন বিশ্লেষকদের আশা ছিল সামরিক শাসনের যুগ পেছনে পড়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সে আশাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার থেকে শুরু করে কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের সামরিক রাজনৈতিক প্রভাব আবারও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
১৯৬০-৮০ দশকে ইন্দোনেশিয়ার সুহার্তো, ফিলিপাইনের মার্কোস কিংবা থাইল্যান্ডের সামরিক জান্তারা এই অঞ্চলের স্বৈরতান্ত্রিক ইতিহাসের অংশ ছিল। তবে আজকের চিত্রে সামরিক শাসন আগের মতো সরাসরি না হলেও, ছায়ার আড়ালে কিংবা নির্বাচনের আড়ালে তারা রাজনৈতিক নেতৃত্ব দখল করে নিচ্ছে। ২০২১ সালে মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জান্তা সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়। থাইল্যান্ড ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সামরিক শাসনের অধীনে ছিল। ইন্দোনেশিয়ায় সাবেক সেনা কমান্ডার প্রাবোয়ো সুবিয়ান্তো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন, যার অতীতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। কম্বোডিয়ার দীর্ঘদিনের শাসক হুন সেন তার সেনাপ্রধান সন্তান হুন মানেতের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছেন, যিনি সেনা পটভূমি থেকে এসেছেন। ভিয়েতনামের শাসক দলের বহু সদস্যই সেনাবাহিনী ও পুলিশের সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।
বাংলাদেশের অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ফজলে এলাহি আকবর বলছেন, স্বাধীনতা সংগ্রামে সেনাবাহিনীর ভূমিকা এসব দেশে তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতায় পা রাখার ভিত্তি তৈরি করে দেয়। ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম কিংবা মিয়ানমারের মতো দেশে সেনাবাহিনী কেবল প্রতিরক্ষার দায়িত্বে ছিল না; তারা রাষ্ট্র নির্মাণেও ভূমিকা রেখেছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এ বাহিনী নিজেকে রাষ্ট্রের স্থায়ী অংশ হিসেবে দেখতে শিখেছে। জাতিগত সংঘাত, বিদ্রোহ, কিংবা নিরাপত্তা সঙ্কটের মতো ইস্যু সামরিক বাহিনীকে রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছে। বিশেষ করে মিয়ানমারের মতো দেশে সেনাবাহিনী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অজুহাতে ক্ষমতা দখল করে রেখেছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সামরিক আধিপত্যের পেছনে শুধুই নিরাপত্তাজনিত কারণ নয়, এতে জড়িত রয়েছে অর্থনৈতিক স্বার্থও।ভিয়েতনামের সামরিক বাহিনী দেশটির বড় কিছু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান যেমন টেলিকম কোম্পানি ও সমুদ্রবন্দর পরিচালনা করে।কম্বোডিয়ার ক্ষমতাসীন দলের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যই সামরিক বা পুলিশ বাহিনীর পটভূমি থেকে এসেছেন। ইন্দোনেশিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্টের ভাই দেশটির অন্যতম ধনী ব্যবসায়ী। এই সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস বলছে, সামরিক-বাণিজ্যিক সম্পর্ক গণতন্ত্রের বিকাশে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অলিগার্ক ও সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সংযোগ সমাজে বৈষম্য ও দুর্নীতি বাড়াচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই সামরিক পুনরুত্থান এককভাবে স্থানীয় রাজনীতির ফল নয়, এটি বৈশ্বিক প্রবণতার অংশ, যেখানে সাহেল অঞ্চলের মতো আফ্রিকান দেশ, মিসর কিংবা পাকিস্তানেও সামরিক প্রভাব পুনরায় দৃশ্যমান হচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সাগর ঘিরে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ এবং চীনের আগ্রাসী অবস্থান ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোতে সামরিক কর্মকর্তাদের প্রভাব বাড়িয়েছে। তবে ফিলিপাইন এখনো তুলনামূলকভাবে সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পেরেছে।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে এই অঞ্চলে সামরিক ব্যয় দ্বিগুণ হয়েছে-১৯.২ বিলিয়ন ইউরো থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১ বিলিয়ন ইউরোতে। সামরিক আধিপত্যের এই বাস্তবতায় সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ব্রুনাই ব্যতিক্রম। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘ সময় ধরে সেনাবাহিনীর প্রভাব এড়িয়ে চলতে পেরেছে। ব্রুনাইয়ের রাজতান্ত্রিক কাঠামোও সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা কমাতে সহায়ক হয়েছে। একইভাবে পূর্ব তিমুরে সাবেক গেরিলা নেতা জেনানা গুসমা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বটে, কিন্তু তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই।এটি একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, সামরিক নেতৃত্বের এই উত্থান শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে না, বরং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতিকেও রূপান্তরিত করতে পারে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এখন আর শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গন্তব্য নয়, এক বৈচিত্র্যপূর্ণ রাজনৈতিক লড়াইয়ের ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। যেখানে সামরিক বাহিনীর পুনরুত্থান, গণতন্ত্রের প্রতিবন্ধকতা এবং বাণিজ্যিক স্বার্থ এক জটিল গাঁঠ গেঁথে ফেলেছে। থাইল্যান্ডের নারেসুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপদেষ্টা পল চেম্বারসের ভাষায়, সামরিক আধিপত্য অনেক সময় নির্ভর করে অবসরপ্রাপ্ত জেনারেলদের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের ওপর। থাইল্যান্ডে রাজতন্ত্রের সমর্থন সামরিক অভ্যুত্থানকে দীর্ঘায়িত করেছে। অন্যদিকে মিয়ানমার বরাবরই সামরিক শাসনে অভ্যস্ত ছিল এবং ২০২১ সালে তারা আবারো তাদের স্বার্থ রক্ষায় ক্ষমতা দখল করেছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সামরিক আধিপত্যের এই পুনরাবৃত্তি একটি গুরুতর সংকেত। গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার আদর্শ এই অঞ্চলে নতুন করে হুমকির মুখে পড়ছে। যতদিন না রাজনীতি, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় শক্তিশালী স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠিত হয়, ততদিন এই অঞ্চলে সামরিক ছায়া রাজনীতি থেকে পুরোপুরি বিদায় নেবে না।


