বিশ্বে যেখানে দক্ষিণ কোরিয়ার জন্মহার সবচেয়ে কম, সেখানে আইভিএফ (ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) চিকিৎসার চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। কেউ আগেভাগেই ডিম্বাণু সংরক্ষণ করছেন, আবার কেউ সন্তান না হলে আইভিএফ চিকিৎসার আশ্রয় নিচ্ছেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশে এই ধরনের চিকিৎসার সংখ্যা প্রায় ৫০% বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখে। শুধু সিওল শহরেই গত বছর প্রতি ৬ শিশুর মধ্যে ১ শিশুর জন্ম হয়েছে আইভিএফ পদ্ধতিতে।
আইভিএফ হলো বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসার একটি পদ্ধতি, যেখানে নারীর ডিম্বাণু ও পুরুষের শুক্রাণু শরীরের বাইরে ল্যাবরেটরিতে নিষিক্ত করা হয় এবং তারপর নিষিক্ত ভ্রূণটি নারীর জরায়ুতে স্থাপন করা হয়। এটি সাধারণত তখন ব্যবহৃত হয় যখন স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণ সম্ভব না হয়।
দক্ষিণ কোরিয়া বারবার বিশ্বের সর্বনিম্ন জন্মহারের রেকর্ড ভেঙেছে। ২০২৩ সালে দেশটির জন্মহার কমে দাঁড়ায় মাত্র ০.৭২-এ, যা বৈশ্বিক গড় ২.২ থেকে অনেক নিচে। এই জন্মহার অব্যাহত থাকলে আগামী ৬০ বছরে দেশের জনসংখ্যা ৫ কোটির কাছাকাছি থেকে অর্ধেকে নেমে আসবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।
দক্ষিণ কোরিয়ার জনসংখ্যা সংকটের মূলে রয়েছে সামাজিক ও আর্থিক চাপ। পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতির কারণে শিশু দেখভালের বেশিরভাগ কাজ পড়ে নারীদের ওপর, দীর্ঘ কর্ম-ঘণ্টা ও উচ্চশিক্ষার খরচ তরুণদের সন্তান নেওয়া থেকে বিরত রাখছে।
আবার আর্থিক ও সাংস্কৃতিক চাপে অনেকের সন্তান নেওয়ার স্বপ্ন শুধু পিছিয়ে গেছে। জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অধিকাংশ দক্ষিণ কোরিয়ান সন্তান চাইলেও সামর্থ্য না থাকায় তা নিচ্ছে না। এছাড়া, প্রথম সন্তান নেওয়ার সময় দক্ষিণ কোরিয়ান নারীদের গড় বয়স প্রায় ৩৪ বছর।
আইভিএফ চিকিৎসা গ্রহণকারী দক্ষিণ কোরিয়ান নারী কিম মি-এ বলেন–‘মানুষ তাদের তরুণবেলা পড়াশোনা, চাকরি খোঁজা এবং উন্নত জীবনযাপনের জন্য প্রস্তুতিতে ব্যয় করে কাটিয়ে দেয়। তবে যখন বিয়ে-সন্তান নিয়ে স্থির হওয়ার সময় আসে, তখন অনেক সময়ই দেখা যায় দেরি হয়ে যায়। আর যত বেশি অপেক্ষা করবেন, শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে গর্ভধারণ ততটাই কঠিন হয়ে ওঠে।”
আইভিএফ চিকিৎসা বেছে নিলে সন্তান ধারণের খরচও অনেক বেড়ে যায়। অনেকে আইভিএফ-এর পথে যাওয়ায় এই চিকিৎসা শিল্প ২০৩০ সালের মধ্যে ২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসার জন্য সহায়তা বৃদ্ধি করেছে। সিওল সরকার ডিম্বাণু সংরক্ষণের জন্য সর্বোচ্চ ২০ লাখ কোরিয়ান ওন (প্রায় ১ হাজার ৪৬০ ডলার) এবং প্রতি আইভিএফ চক্রে ১১ লাখ ওন পর্যন্ত ভর্তুকি দিচ্ছে।
ওয়াশিংটনের পপুলেশন রেফারেন্স ব্যুরোর প্রেসিডেন্ট জেনিফার সিয়ুবা বলেন, ‘এটি নীতি নির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত যে অনেকের সন্তান নেয়ার ইচ্ছা থাকলেও, নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে পারছেন না।’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবার নিয়ে কোরিয়ান সমাজে চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আসায় বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসার দিকে ঝুঁকছে অনেকেই।


