দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে যে কয়েকটি সীমান্ত দ্বন্দ্ব অনিরসনযোগ্য রয়ে গেছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার সীমান্ত বিরোধ। এই দ্বন্দ্ব কখনো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের রূপ না পেলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উভয় পক্ষের জাতীয়তাবাদী আবেগ ও ঐতিহাসিক স্মৃতি এই বিরোধকে পুনরুজ্জীবিত করে তুলেছে। আজকের সংঘাত মূলত একটি প্রাচীন মন্দির, বিভ্রান্তিকর উপনিবেশিক মানচিত্র এবং আধুনিক রাজনৈতিক উত্তেজনার সংমিশ্রণ।
এই অঞ্চলটি এক সময় খমের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা ৯ম থেকে ১৫শ শতাব্দীর মধ্যে আধুনিক কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের বিস্তৃত অংশ শাসন করত। খমের সাম্রাজ্যের সাংস্কৃতিক ও স্থাপত্যিক উত্তরাধিকার এখন কম্বোডিয়ার জাতীয় গর্ব, বিশেষ করে অংকরভাট ও অন্যান্য খমের মন্দির। কিন্তু বহু প্রাচীন খমের মন্দির বর্তমানে থাইল্যান্ডের ভূখণ্ডে অবস্থিত, যেটি দীর্ঘদিন ধরে একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের জন্ম দিয়েছে।
বিশ শতকের গোড়ার দিকে যখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া উপনিবেশিক শক্তির কবলে পড়ে, তখন ইন্দোচীন (বর্তমান কেম্বোডিয়া, লাওস ও ভিয়েতনাম) ও থাইল্যান্ডের মধ্যে একাধিক চুক্তির মাধ্যমে সীমান্ত নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু অনেক স্থানেই এই সীমান্তরেখা অস্পষ্ট থেকে যায়। উপনিবেশিক মানচিত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থান, যেমন “তা মিউন থম” মন্দির, “প্রাহ উইহেয়ার” মন্দির ইত্যাদি কখনো একপক্ষ, কখনো অন্য পক্ষের ভূখণ্ড বলে চিহ্নিত হয়।
১৯৬২ সালে প্রাহ উইহেয়ার মন্দির নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালত (ICJ) কেম্বোডিয়ার পক্ষে রায় দেয়, কিন্তু চারপাশের ভূমি অর্থাৎ মন্দির সংলগ্ন জমি নিয়ে বিতর্ক থেকেই যায়। এ বিষয়েই ২০০৮ সালের দিকে দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
২০১১ সালে মিউন থম ও প্রাহ উইহেয়ার এলাকায় আর্টিলারি গুলিবিনিময় করে দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষ চূড়ান্ত রূপ নেয়। অন্তত ১৮ জন নিহত হয় এবং হাজার হাজার মানুষ সীমান্ত অঞ্চল থেকে পালিয়ে যায়। এরপর অস্থায়ীভাবে বিরতি হলেও, সামরিক উপস্থিতি এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে স্থলমাইন পুঁতে রাখা এই উত্তেজনার ছায়া টিকিয়ে রাখে।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে এই দ্বন্দ্ব আবার তীব্র আকার ধারণ করে। থাইল্যান্ড অভিযোগ করে যে, কম্বোডিয়ান সেনাবাহিনী সীমান্ত অতিক্রম করে থাই ভূখণ্ডে হামলা চালায় এবং ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে তাদের একজন সৈন্য গুরুতর আহত হয়। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় থাই বিমান বাহিনী এফ-১৬ যুদ্ধবিমান দিয়ে কেম্বোডিয়ার অবস্থানে বোমা বর্ষণ করে, যার ফলে কয়েকজন কম্বোডিয়ান সৈন্য নিহত হয়।
এই ঘটনার পর উভয় দেশ রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে, কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং সীমান্তে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করে। বাস্তুচ্যুত হয় প্রায় চল্লিশ হাজার মানুষ। স্কুল, হাসপাতাল বন্ধ হয়ে যায়। দুই পক্ষই নিজেদের ‘আত্মরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া’ বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষের জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলো এই সংঘাতকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করছে। থাইল্যান্ডে সামরিকপন্থী সরকার ও কেম্বোডিয়ার কর্তৃত্ববাদী প্রশাসন উভয়ই নিজেদের দেশের অভ্যন্তরীণ চাপ থেকে দৃষ্টি সরাতে এই সংকটকে জিইয়ে রাখতে পারে। এ অবস্থায় সীমান্ত সংঘর্ষ যদি আরও কয়েক ধাপে উস্কে ওঠে, তাহলে তা একটি পূর্ণাঙ্গ সীমান্ত যুদ্ধের রূপ নিতে পারে।
এই সম্ভাব্য যুদ্ধ কেবল দুই দেশ নয়, বরং পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে। ASEAN এখন পর্যন্ত দৃশ্যত নীরব, তবে সংঘাত বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চীন, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়া মধ্যস্থতায় আগ্রহ দেখাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তিরাও থাইল্যান্ডের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘তা মিউন থম’ ও আশেপাশের অঞ্চলকে “সাংস্কৃতিক ও শান্তি অঞ্চল” ঘোষণা দিয়ে উভয় দেশের যৌথ প্রশাসনের অধীনে আনলেই হয়ত উত্তেজনা প্রশমিত হতে পারে। কিন্তু এমন একটি সমাধান তখনই সম্ভব যখন উভয় পক্ষই রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল এবং জনগণের কণ্ঠকে মূল্যায়ন করে।
থাইল্যান্ড–কেম্বোডিয়ার এই সীমান্ত সংঘাত কেবল জমি নিয়ে নয়; এটি ইতিহাস, পরিচয়, জাতীয় অহংকার এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি বহুমাত্রিক দ্বন্দ্ব। যদি তীব্র সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়ে, তবে এটি নিছক সীমান্ত সমস্যা থেকে বেরিয়ে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকটের জন্ম দিতে পারে। একে শুধু অস্ত্র দিয়ে নয়, ইতিহাস, কূটনীতি এবং মানবিক বোধ দিয়ে মোকাবিলা করাই এখন সময়ের দাবি।


