পাহাড় আর সমুদ্রবেষ্টিত রাখাইন বহুদিন ধরেই অঘোষিত যুদ্ধক্ষেত্র। মিয়ানমারের এ রাজ্যটির রাজধানী সিত্তের দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেন তোয়ান মারত নাইং। কৈশোরে দারিদ্র্য তাকে নিয়ে যায় কাচিনের খনিজ উত্তোলন খনিতে। সেখানেই সামরিক প্রশিক্ষণের হাতেখড়ি। ২০০৯ সালে মাত্র ৩০ বছর বয়সে গড়ে তোলেন আরাকান আর্মি। দায়িত্ব নেন কমান্ডার ইন চিফের। সামরিক কৌশল, জাতিগত পরিচয় ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার মিশেলে গড়া তার নেতৃত্বে আজ রাখাইনের ৯০ শতাংশ আরাকান আর্মির দখলে, যা বদলে দিয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতির চিত্রপট। কৈশোরে তিনি কাচিন রাজ্যের খনিতে কাজ করার সময় তার পরিচয় হয় কাচিন ইনডিপেনডেন্স আর্মির সঙ্গে। সশস্ত্র ওই সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। যারা পরবর্তী সময়ে তাকে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেন।
১৯৯৮ সালে তিনি ‘ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টি অব আরাকান’-এ যোগ দিতে চেয়েছিলেন। সেই সংগঠনের প্রধান সেনা অভিযানে নিহত হন। এরপর ২০০৪ সালে তার সঙ্গে যুক্ত হন চিকিৎসক নায়ো তোয়ান অং। দুজন মিলে ২০০৯ সালে গঠন করেন আরাকান আর্মি। যার লক্ষ্য ছিল রাখাইন রাজ্যে স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা। কাচিন ইনডিপেনডেন্স আর্মির সহায়তায় মাত্র ২৬ সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে আরাকান আর্মি। বর্তমানে তার বাহিনীর সদস্য ২০-২৫ হাজার। তিনি সরাসরি যুদ্ধে নামার আগে জোট গঠনের দিকে মনোযোগ দেন। ২০১৫ সালে কাচিন, তাআং ও কোকাং বাহিনীর সঙ্গে ‘ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স’ গঠন করেন, যা আরাকান আর্মিকে সামরিকভাবে আরো শক্তিশালী করে।
ইয়াঙ্গুনে পর্যটন গাইড হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তোয়ান মারত নাইংকে গড়ে তুলেছে একজন দক্ষ ইংরেজিভাষী হিসেবে। এ অভিজ্ঞতা তাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যোগাযোগের সুযোগ করে দেয়। একই সঙ্গে তিনি সামরিক কৌশল, দর্শন, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, ভূগোল ও ইতিহাসেও দক্ষতা লাভ করেন। গেরিলা নেতার বাইরেও হয়ে ওঠেন একজন চিন্তক ও কৌশলবিদ। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের পর পাল্টে যায় দৃশ্যপট। সামরিক সরকার পতনের দাবিতে মিয়ানমারজুড়ে শুরু হওয়া প্রতিরোধ আন্দোলনের মুখপাত্র হয়ে ওঠে আরাকান আর্মি। তোয়ান মারত নাইং নিজে ব্যক্তিগতভাবে সেনাশাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। রাজনৈতিকভাবে বৃহত্তর বিপ্লবের পক্ষে নিজের অবস্থান জানান দেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যোগাযোগ বাড়ান।
তিনি বরাবরই জোর দিয়েছেন রাখাইন জনগণের নিজস্ব স্বায়ত্তশাসনের দাবির ওপর। তার মতে, নতুন মিয়ানমার হবে একটি ফেডারেল কাঠামোর দেশ, যেখানে প্রতিটি জাতিগোষ্ঠী নিজের অঞ্চলের ওপর সার্বভৌম কর্তৃত্ব বজায় রাখবে। এ ভাবনার প্রতিফলন ঘটেছে তার নেতৃত্বাধীন আরাকান আর্মির সামরিক ও কূটনৈতিক কার্যক্রমে। জাতিগত ঐক্যকে প্রাধান্য দিয়ে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী যেমন কাচিন ইনডিপেনডেন্স আর্মি, কারেন ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মিসহ অন্যান্য সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে ঐক্য গড়ে তোলেন। এ ঐক্যের ভিত্তিতে তারা সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যা বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সামরিক জান্তার পতন ঘটায়।
মিয়ানমারের দক্ষ সামরিক বাহিনীকে কৌশলের যুদ্ধে পরাজিত করেন তিনি। তার কৌশল ছিল তিন স্তরবিশিষ্ট। প্রথমত, গ্রামীণ এলাকাগুলো থেকে জান্তা সেনাবাহিনীকে উৎখাত করা। স্থানীয়দের আরাকান আর্মিতে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করা। তিনি কৌশলে আরাকানিজ তরুণদের সংগঠিত করতে থাকেন, বিশেষত যাদের মধ্যে অসন্তোষ, বঞ্চনা ও শিকড়চ্যুতির বেদনা ছিল প্রবল। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় প্রশাসন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়া। সর্বশেষ আধুনিক অস্ত্র ও ড্রোনের মাধ্যমে সরকারি সেনাবাহিনীর ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হানা। প্রতিটি অভিযানে তার এ কৌশল অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
সামরিক সাফল্যের পর অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনেও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধে চীনের মধ্যস্থতার প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। এটা স্পষ্ট করে যে, নাইং চান না রাখাইনের সামরিক ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বেইজিং দ্বারা নির্ধারিত হোক। কিন্তু তিনি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নও করেননি। কারণ রাখাইন উপকূলে চীনের বিনিয়োগ (বিশেষ করে কিউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর ও চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর) আরাকান আর্মির কৌশলগত প্রভাব বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। এ দ্বৈত নীতির মাধ্যমে নাইং রাখাইন অঞ্চলে চীনের প্রভাবকে সীমিত রাখার চেষ্টা করছেন, আবার তার থেকে সম্ভাব্য কৌশলগত সুবিধাও নিচ্ছেন।
ভারত প্রথম দিকে আরাকান আর্মিকে নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করলেও সম্প্রতি বিদ্যমান বাস্তবতা ও চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। নাইং জানেন ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির অংশ হিসেবে কৌশলগত কালাদান মাল্টিমোডাল প্রজেক্ট রাখাইনের মধ্য দিয়ে গেছে, এ রুটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ভারতের অগ্রাধিকার। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে নাইং ভারতকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, রাখাইন অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আরাকান আর্মির সঙ্গে সমন্বয় করাই ভারতের জন্য যুক্তিসংগত। বিশ্লেষকদের মতে, চীন ও ভারত—এ দুই শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় তোয়ান মারত নাইংয়ের মূল কৌশল হলো ভারসাম্য রক্ষা ও কোনো এক পক্ষের ওপর নির্ভর না হয়ে রাখাইন রাজ্যের স্বার্থে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করে নেয়া।
তবে আন্তর্জাতিকভাবে তোয়ান মারত নাইংয়ের ভাবমূর্তি শুধু ইতিবাচক নয়। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ, যা তাকে সমালোচনার মুখে ফেলেছে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মেজর জেনারেল তোয়ান মারত নাইংয়ের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের জাতিগত স্বীকৃতি না দিয়ে নাগরিক হিসেবে অধিকার দেয়ার পক্ষে ছিলেন তিনি। এখন অবশ্য পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। রাখাইনরা সাধারণত বেশ জাতীয়তবাদী। এছাড়া সম্প্রতি রোহিঙ্গারা আরাকান আর্মির বিপক্ষে অস্ত্র তুলে নেয়ায় পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। নেতা হিসেবে রোহিঙ্গাদের পক্ষে কথা বললে কট্টর জাতীয়তবাদীদের কাছে তার জনপ্রিয়তা হ্রাসের ঝুঁকি রয়েছে।’
মাত্র ৩০ বছর বয়সে সশস্ত্র সংগঠন গড়া তরুণ তোয়ান মারত নাইং পাহাড়ি এলাকা থেকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসবেন, তা কেউ ভাবেনি। বিপুল জনসমর্থন, সুসংগঠিত বাহিনী, কূটনৈতিক কৌশল ও কাঠামোবদ্ধ রাজনৈতিক অবস্থান মিলিয়ে রাখাইন রাজ্যের এ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতা বর্তমানে শুধু মিয়ানমারে নয়, সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে পরিণত হয়েছেন।


