আজকের মধ্য এশিয়া কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির মানচিত্র যদি একটু আলাদা হতো, তাহলে তার পেছনে অন্যতম কারণ হতে পারতো তৈমুর লং-এর জীবন ও রহস্যঘেরা মৃত্যু। ইতিহাসের এই নির্ভীক দিগ্বিজয়ীর আকস্মিক পরিণতি আজও রহস্যে মোড়ানো। তাঁর মৃত্যু কী প্রকৃতপক্ষে প্রাকৃতিক? নাকি ইতিহাসের গভীরে লুকানো কোনো সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক চক্রান্ত?
১৩৩৬ সালে সমরখন্দের নিকটবর্তী শহরে জন্মগ্রহণ করেন তৈমুর, যিনি পরবর্তীকালে তৈমুর লং (Tamerlane) নামে ইতিহাসে পরিচিত হন। চেঙ্গিস খানের উত্তরাধিকার দাবি করে তিনি মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন উপজাতি ও গোষ্ঠী একত্রিত করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই পারস্য, ইরাক, সিরিয়া, আনাতোলিয়া (আজকের তুরস্ক) এবং ভারত (দিল্লির তৎকালীন সুলতানাত)-এ জয়যাত্রা চালান। তাঁর বাহিনী ছিল মধ্যযুগীয় বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী, আর তাঁর প্রশাসনব্যবস্থা ছিলো নির্ভুল ও কঠোর শাসনের প্রতীক।
তবে তৈমুর কেবল এক দিগ্বিজয়ী সেনাপতি ছিলেন না, তিনি সমরখন্দে সংস্কৃতি, স্থাপত্য ও শিল্পকলারও পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। যদিও পশ্চিমা ঐতিহাসিকরা প্রায়ই তাঁকে নির্মম ও নৃশংস দখলদার হিসেবে চিত্রিত করেছেন, তবুও মধ্য এশিয়ার অনেক জনগোষ্ঠী তাঁকে জাতীয় ঐক্য ও সাংস্কৃতিক রেনেসাঁর পথিকৃৎ বলে মনে করে।
১৪০৫ সাল, তখন তৈমুরের বয়স প্রায় ৬৯–৭০ বছর। জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে তিনি বিশাল সামরিক বাহিনী নিয়ে চীনের মিং সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযানে যাত্রা শুরু করেন। লক্ষ্য ছিল চীনের ধনী প্রদেশগুলো জয় করে সাম্রাজ্যের পূর্ব সীমা আরও প্রসারিত করা। কিন্তু ঠিক এই সময়ই উত্তরাধিকার প্রশ্ন, সেনাবাহিনীর ক্ষয়িষ্ণু মনোবল, চরম ঠাণ্ডা আর অভ্যন্তরীণ রাজনীতির টানাপোড়েন শুরু হয়। কিছু উচ্চপদস্থ সেনাপতি এবং আত্মীয়স্বজন এই ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে অনাগ্রহী হয়ে ওঠেন।
পথে আধুনিক কাজাখস্তানের ওত্রার (Otrar) শহরের নিকটে তৈমুর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর দেহে তীব্র জ্বর, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টের উপসর্গ দেখা দেয়। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
আধুনিক চিকিৎসা তথ্য অনুযায়ী সম্ভাব্য কারণ ছিল নিউমোনিয়া, Hypothermia (ঠান্ডাজনিত শারীরিক ব্যর্থতা) অথবা গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস। তবে প্রশ্ন হলো এত দ্রুত ও হঠাৎ করে কি একজন রণাঙ্গনের কঠোর যোদ্ধা মৃত্যুবরণ করতে পারেন?
কিছু ঐতিহাসিক রুশ ও ইরানি স্কলাররা মনে করেন, তৈমুরের মৃত্যুর পেছনে ছিল তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের চক্রান্ত। তৈমুর তখনও স্পষ্ট উত্তরাধিকার ঘোষণা করেননি। তাঁর সন্তান ও নাতিরা অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ে লিপ্ত ছিলেন। বিশেষ করে সেনাপতি ও সম্ভ্রান্ত অভিজাতরা চীন অভিযানের ঝুঁকিতে অখুশি ছিলেন।
তাদের পক্ষে সহজ সমাধান ছিল তৈমুরকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা। সম্ভাব্য বিষ ছিল আরসেনিক ট্রাইঅক্সাইড। এই বিষ সহজেই খাদ্য বা পানীয়তে মিশিয়ে দেওয়া যেত এবং লক্ষণগুলো ডায়রিয়া, দুর্বলতার সাথে এতটাই মিলত যে চিকিৎসকেরাও প্রাকৃতিক মৃত্যু মনে করতেন।
চীনের মিং সাম্রাজ্য তৈমুরকে ভয় পেত। সমরখন্দ ও আশেপাশের অঞ্চলগুলোতে চীনা বণিক ও দূতেরা বহু বছর ধরে সক্রিয় ছিল। অনেক ঐতিহাসিক অনুমান করেন, চীনা গুপ্তচররা তৈমুরের শিবিরে অনুপ্রবেশ করে তাঁর খাদ্যদ্রব্যে বিষ প্রয়োগ করে। এর ফলে চীন আক্রমণ থেমে যায় এবং চীন দীর্ঘদিন ধরে মধ্য এশিয়ার আগ্রাসন থেকে মুক্ত থাকে।
১৯৪১ সালে সোভিয়েত প্রত্নতত্ত্ববিদ মিখাইল গেরাসিমভ তৈমুরের সমাধি (Gur-e-Amir Mausoleum, সমরখন্দ) খনন করেন। তাঁর সমাধিতে একটি আরবি শিলালিপি পাওয়া যায়। সেখানে লেখা ছিলো – ‘যে আমার কবর খুলবে, সে আমার থেকেও ভয়ংকর এক আক্রমণকে মুক্ত করবে।’
আশ্চর্যজনকভাবে কবর খোলার তিন দিনের মাথায় হিটলার সোভিয়েত ইউনিয়নে আক্রমণ (অপারেশন বারবারোসা) চালান। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ব ইউরোপীয় রণাঙ্গনে ভয়াবহ রক্তপাত ঘটে। এ ঘটনা থেকে অনেকেই মনে করেন, তৈমুরের মৃত্যু ও তাঁর কবর “অভিশপ্ত” ছিল।
১৯৪১ সালের প্রত্নতাত্ত্বিক খননে তৈমুরের দেহাবশেষ থেকে নমুনা নিয়ে গবেষণা হয়। তার ফলাফলে তৈমুরের দেহে আর্থ্রাইটিস, গাউট ও অন্ত্রের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের প্রমাণ মেলে। বিষ প্রয়োগের সরাসরি প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবে ল্যাব প্রযুক্তি সীমাবদ্ধ ছিল।
তৈমুর লং-এর মৃত্যু আসলে শুধুই এক প্রবীণ সেনানায়কের প্রাকৃতিক পরিণতি? নাকি এটি ছিল একটি সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র যার ফলে মধ্য এশিয়া ও চীনের রাজনৈতিক মানচিত্র চিরতরে পাল্টে যায়? এ প্রশ্নের সরল উত্তর নেই। তবে এটুকু নিশ্চিত তৈমুরের মৃত্যু না হলে হয়তো চীনের ইতিহাস, এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ অন্যরকম হতো।


