তেজস্ক্রিয়তা মোকাবিলায় ফুল

পরমাণু শক্তির আবিষ্কার মানবজাতিকে প্রযুক্তিগত দিক থেকে এক নতুন যুগে প্রবেশ করিয়েছে। এর মাধ্যমে যেমন বিশাল শক্তি ও সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হয়েছে, তেমনি তৈরি হয়েছে এক চরম বিপদের আশঙ্কা, পরিবেশ ও জীবজগৎ ধ্বংসের সম্ভাবনা। পরমাণু শক্তির ব্যবহারে উৎপন্ন বর্জ্য কেবল মানুষ নয় বরং সমগ্র জৈব পরিবেশের ওপর দীর্ঘস্থায়ী ও চিরস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।পারমাণবিক বর্জ্য হলো এক ধ্বংসাত্মক দূষক। ইউরেনিয়াম, সিজিয়াম-১৩৭ (137Cs), স্ট্রনটিয়াম-৯০ (Sr)-এর মতো বিকিরণযুক্ত পদার্থ মাটি ও পানিতে ছড়িয়ে পড়লে সেগুলো গাছপালা শোষণ করে এবং খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের ও প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করে। এই রেডিওনিউক্লাইডগুলো শরীরের কোষ ও টিস্যুকে চিরতরে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। হাড়ের ক্যান্সার, লিউকেমিয়া, এমনকি জেনেটিক পরিবর্তন ঘটিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এর শিকার হতে পারে।

তাই প্রশ্ন ওঠে, এই বিপজ্জনক পদার্থগুলো কীভাবে মাটি ও পানি থেকে সরানো যায়? চেরনোবিল দুর্ঘটনার (১৯৮৬) পর থেকেই নানা আধুনিক প্রযুক্তি যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করে এই সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু প্রযুক্তির পাশাপাশি বিজ্ঞানীরা ফিরে তাকিয়েছেন প্রকৃতির দিকে, সেই পুরনো সহচর উদ্ভিদের দিকে যাদের সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান হাজার বছরের। উদ্ভিদ শুধু খাদ্য ও অক্সিজেন সরবরাহ করে না, অনেক গাছপালা প্রকৃতির পরিশোধক হিসেবেও কাজ করে। বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন গাছের কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ, ভারী ধাতু পরিশোধন বা দূষক শোষণ এসব সক্ষমতা নিয়ে গবেষণা করছেন। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ফাইটোরিমেডিয়েশন, অর্থাৎ গাছের মাধ্যমে দূষণ দূর করার পদ্ধতি।

এই প্রক্রিয়ায় এমন গাছ নির্বাচন করা হয় যেগুলো খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় না কিন্তু দূষণ শোষণে দক্ষ। এতে করে খাদ্যশৃঙ্খলে দূষক ঢোকার ঝুঁকি কমে। হাজারো উদ্ভিদের মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর হিসেবে উঠে এসেছে সূর্যমুখী (Helianthus annuus L.)। ১৯৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ইলিয়া রাসকিন ও তাঁর গবেষক দল দেখান, সূর্যমুখী হাইড্রোপনিক চাষে ইউরেনিয়ামসহ ভারী ধাতু শোষণে অত্যন্ত দক্ষ। ওহাইওতে দূষিত পানিতে সূর্যমুখী বসিয়ে দেখা যায় মাত্র ২৪ ঘণ্টায় পানির ইউরেনিয়াম মাত্রা ৯৪% কমে গেছে। সূর্যমুখী দ্রুত বাড়ে, অনেক ধরনের পরিবেশে টিকে থাকে এবং প্রচুর পরিমাণে রেডিওঅ্যাকটিভ পদার্থ নিজের মধ্যে জমা করতে পারে।

১৯৯৪ সালে চেরনোবিল দুর্ঘটনার পর এক আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় সূর্যমুখী ব্যবহার করে সিজিয়াম-১৩৭ ও স্ট্রনটিয়াম-৯০ পরিষ্কারের সফলতা অর্জিত হয়। চুল্লির এক কিলোমিটারের মধ্যেও সূর্যমুখী রোপণ করা হয়েছিল। ফাইটোটেক নামের সংস্থার মতে, এই পদ্ধতিতে খরচ কমেছে ১০%। সূর্যমুখী আরও তামা (Cu²⁺), ক্যাডমিয়াম (Cd2+), সিসা (Pb2+), দস্তা (Zn2+) ইত্যাদিও শোষণ করতে পারে। তবে সূর্যমুখী পানিতে যেমন কার্যকর, মাটিতে ততটা নয়। এই সীমাবদ্ধতা মোকাবেলায় বিজ্ঞানীরা নজর দিয়েছেন অন্য গাছে। পারডিউ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেরি অ্যালিস ওয়েব তামাক গাছ নিয়ে গবেষণা করেন এবং আবিষ্কার করেন, এটি স্ট্রনটিয়াম-৯০ শোষণে সক্ষম। এই আইসোটোপ ক্যালসিয়ামের মতো আচরণ করে এবং গাছ সেটিকে শোষণ করে ফেলে।

ফুকুশিমার (২০১১) পরেও জাপানে সূর্যমুখীসহ বিভিন্ন গাছ রোপণ করা হয়, কিন্তু ততটা ফল মেলেনি। গবেষকদের মতে, এর পেছনে ছিল সময়গত পার্থক্য ও মাটি-জলের রসায়ন। চেরনোবিলে গাছ রোপণ হয়েছিল অনেক বছর পর, যেখানে ফুকুশিমায় তা হয়েছিল সঙ্গে সঙ্গেই।তাছাড়া সূর্যমুখীর জেনেটিক ভিন্নতাও এক কারণ। তবে গবেষণাগারে সূর্যমুখী ও ইন্ডিয়ান মাস্টার্ডের মতো উদ্ভিদ সিজিয়াম-১৩৭, কোবাল্ট-৬০ শোষণে দক্ষ প্রমাণিত হয়েছে। যদিও রোবট, ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি দূষণ ঠেকানোর কাজ করছে, তারপরও কম খরচে, সহজলভ্য এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে উদ্ভিদের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। গাছ শুধু সৌন্দর্য নয়, পরিবেশ রক্ষার এক নীরব যোদ্ধা।

যখনই আপনি ইউক্রেনের বিস্তীর্ণ সূর্যমুখী ক্ষেত দেখবেন মনে রাখবেন-এই গাছগুলো একদিন মৃত্যুবাহী বিকিরণকে শোষণ করে আবার প্রাণকে ফিরিয়ে এনেছিল।





LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন