কিশোর-কিশোরীরা যখন একটি নিরুদ্বিগ্ন শৈশব এবং আসন্ন প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের দায়িত্বের মাঝামাঝি বাস করে তখন বিশ্রামের সময় বলতে গেলে পাওয়াই যায় না। যখন তারা টিনএইজে পৌঁছে তখন তাদের শরীর ও মস্তিষ্ক এমন পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যায় যা প্রায়ই ব্যাখ্যা করা হয় না বা ঠিকভাবে অনুধাবন করা হয় না। এই উদ্বিগ্ন সময়গুলোতে যৌনশিক্ষার গুরুত্ব যে কতটা অপরিহার্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যৌনশিক্ষা নিয়ে অনেক ভুল ধারণা আছে। এটি আসলে কী তা বুঝতে UNICEF এর স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. রিয়াদ মাহমুদ ব্যাখ্যা করেন, “যৌনশিক্ষা শুধুমাত্র যৌনতা সম্পর্কিত নয়। নিরাপদ যৌন সম্পর্ক এবং গর্ভধারণ প্রতিরোধের তথ্য ছাড়াও মানুষকে তাদের শরীর সম্পর্কে সচেতন হতে, সীমানা সম্মান করতে এবং সম্মতির গুরুত্ব বুঝতে শেখায়।”
তিনি তার গুরুত্ব সম্পর্কে আরও বলেন, “যৌনশিক্ষা কিশোর-কিশোরীদের গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান, মনোভাব এবং দক্ষতা প্রদান করে। যা তাদের স্বাস্থ্য, মঙ্গল এবং মর্যাদা রক্ষা করতে সহায়ক।” বিদ্যমান একাডেমিক গবেষণা ড. রিয়াদের বক্তব্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।২০১৫ সালের ইউনাইটেড নেশনস গ্লোবাল রিভিউ Comprehensive sexuality education (CSE) কে যৌন এবং প্রজনন স্বাস্থ্য উন্নত করার সাথে যুক্ত করেছে। যা যৌন অসুস্থতা, ঐওঠ এবং অপ্রত্যাশিত গর্ভধারণের হ্রাস ঘটায় এবং নিরাপদ যৌন অভ্যাসের প্রচার করে। পাশাপাশি যৌন সহিংসতা হ্রাস এবং লিঙ্গ সমতারও উন্নয়ন ঘটায়।
তবে এত গুরুত্ব সত্ত্বেও বাংলাদেশে যৌনশিক্ষা সম্পর্কিত সরকারী নীতিমালা নেই। ড. রিয়াদ ব্যাখ্যা করেন, “যৌনশিক্ষা সরকারীভাবে উল্লেখ করা হয়নি,” এবং “বিভিন্ন কিশোর স্বাস্থ্য কর্মসূচির মাধ্যমে যৌনশিক্ষা এর কিছু অংশ বাস্তবায়িত হচ্ছে। যেমন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন প্রোগ্রামের মাধ্যমে।” তদুপরি যৌনশিক্ষা কেবল খণ্ড-খণ্ডভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB) পাঠ্যক্রমের অধীনে। বেশিরভাগ বিষয়গুলি শারীরিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবন দক্ষতা শিক্ষা, কল্যাণ এবং আংশিক কিছু বইতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
অনেক বাইরে পড়া ছাত্রদের জন্যও NCTB বিষয়বস্তুর সাথে মিল রেখে বিভিন্ন উদ্যোগ পরিচালিত হচ্ছে। উদয়ন হাই স্কুলের প্রধান জাহুরা বেগম ইউনিসেফের সহায়তায় অনুষ্ঠিত দুটি ইভেন্টের কথা উল্লেখ করেন যেখানে যৌনশিক্ষায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করার জন্য সেমিনার, ভিজ্যুয়াল প্রেজেন্টেশন এবং আর্ট প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। ড. রিয়াদ আরও উল্লেখ করেন স্কুল ভিত্তিক কিশোর স্বাস্থ্য কর্মসূচি (SBAHP) এবং জেন্ডার ইকুইটি মুভমেন্ট ইন স্কুলস (GEMS) এর মতো কার্যক্রম যেগুলো বিশেষভাবে গ্রামীণ এলাকায় সক্রিয় করা উচিত। যৌনশিক্ষা শিক্ষাক্রমের একটি অংশ দেশে এর অকার্যকর বাস্তবায়ন আরও অনেক কিছু করার প্রয়োজনীয়তা জানান দেয়। ড. রিয়াদ কিছু চ্যালেঞ্জের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, “সমাজে যৌনতা সম্পর্কিত ট্যাবুর কারণে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে প্রাথমিক প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত হলেও সেখানে স্পষ্ট যৌনশিক্ষা শব্দটি এড়িয়ে যাওয়া হয়।”
এটি কিশোর-কিশোরীদের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চুপচাপ বা পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়ার দিকে পরিচালিত করে। যৌনশিক্ষা এর কিছু উপাদানের সূক্ষ্মতা প্রয়োজনীয়ভাবে শিক্ষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আনা উচিত। যা বাস্তবায়িত হয় না বললেই চলে। ইউনিসেফের সাবেক পরামর্শক শামিমা চৌধুরী বলেন “অভিভাবকদেরও যৌনশিক্ষা সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া দরকার। অন্যথায় ছাত্ররা স্কুলে যা শিখে তা বাড়িতে প্রয়োগ করতে পারে না।” তিনি বিশেষভাবে গ্রামীণ এলাকায় কমিউনিটির সমর্থনের গুরুত্বে জোর দেন। যাতে ছাত্ররা তাদের শিখিত বিষয়গুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ করতে পারে।


