ঢাকায় শব্দদূষণ নীরব ঘাতক

অন্তর্বর্তী সরকার ঢাকায় হর্ন ব্যবহারের জন্য কঠোর শান্তির ঘোষণা দিয়েছে। যেখানে প্রথমবার অপরাধীদের জন্য ৫০০ টাকা জরিমানা করা হবে এবং পুনরাবৃত্তি অপরাধে বড় জরিমানা আরোপ করা হবে। এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য হল হর্নের কারণে সৃষ্ট ব্যাপক শব্দদূষণ কমানো। এ নিয়ম রাজধানীর প্রধান এলাকাগুলোর মাধ্যমে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে পুরো শহরে এবং পরবর্তীতে অন্যান্য বিভাগীয় শহরেও সম্প্রসারিত হবে। তবে ঢাকার শব্দদূষণ শুধুমাত্র হর্নের মাধ্যমে হয় না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে লাউডস্পিকার, বিজ্ঞাপন এবং নির্মাণ কাজ। অন্তর্বর্তী সরকার শব্দদূষণ কমিয়ে একটি “নিম্ন-শব্দ” দেশ তৈরি করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

গত বছর অক্টোবর ১ তারিখ থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তিন কিলোমিটার পরিসরকে একটি “সাইলেন্ট জোন” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ এবং নিয়ম ভঙ্গকারীদের জন্য জরিমানা অথবা কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে এবারই কি প্রথমবার হর্ন কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে? এর উত্তর হলো, মোটেই না। আগেও এমন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং আইনও তৈরি করা হয়েছে তবে কার্যকর প্রয়োগে বার বার ঘাটতি দেখা গেছে। ঢাকার সামাজিক বাস্তবতাগুলি অনুধাবন করে শুধুমাত্র জরিমানা আরোপ করা কি হর্ন কমানোর ক্ষেত্রে যথেষ্ট হবে? যদি মৌলিক সমস্যা এবং বিস্তৃত ব্যবস্থা না নেয়া হয় তবে এই উদ্যোগও হয়তো আরেকটি অপ্রতিপালিত প্রতিশ্রুতি হয়ে উঠবে।

২০১৭ সালে হাইড্রোলিক হর্ন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তবে অন্যান্য উচ্চ ডেসিবেল হর্নের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। রিপোর্ট অনুযায়ী কিছু হর্ন ১১০ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দ উৎপন্ন করে। এই ধরনের হর্নের আমদানি এখনও নিয়ন্ত্রিত হয়নি। হর্ন বাজানোর অভ্যাস যেন গৌণ হয়ে গেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে হর্ন বাজানোর বিরুদ্ধে পদক্ষেপগুলি প্রায় সময়িক এবং ঘটনাড় – কেন্দ্রিক মনে হয়। রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যাক্ট অনুযায়ী উচ্চ শব্দের হর্ন ব্যবহারের জন্য ১০,০০০ টাকা জরিমানা ধার্য করা হলেও তা কখনো কার্যকর করা হয়নি। হতাশ নাগরিকরা প্রথাগত হর্ন বাজানোর জন্য সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভপ্রকাশ করেছেন। তবে সচেতনতামূলক প্রচারণাগুলি তেমন কোনো ফলপ্রসূ পরিবর্তন আনতে পারেনি। পুরো বছরব্যাপী কার্যক্রমের অভাব, এসব প্রচারণাকে কেবল বিজ্ঞপ্তি বানিয়ে রাখে সমাধান হয় না।

পরিবেশ অধিদপ্তর ঢাকায় হর্নের অনুমোদিত শব্দমাত্রার কথা ঘোষণা করলেও এই বিধিনিষেধগুলি কার্যকর করার জন্য কোনো উদ্যোগ নেই। যা গাড়ি বা মোটরসাইকেল নির্মাণ বা সমাবেশের সময় এসব নিয়ম মানার নিশ্চয়তা প্রদান করবে। গাড়ি নির্মাতারা নিজেরাই উল্লেখ করেছেন, হাইড্রোলিক হর্ন নিষিদ্ধ হলেও অন্যান্য প্রকার হর্ন সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। ২০০৭ সালে ঢাকার কয়েকটি সড়কে হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। এরপর প্রতিবেদন পাওয়া যায় যে কর্তৃপক্ষ দৈনিক জরিমানা আরোপ করছিল। তবে আজকাল এই প্রয়োগের কার্যকারিতা প্রায় নেই বললেই চলে। কারণ সারা শহর জুড়ে হর্ন বাজানো অব্যাহত রয়েছে। অনেক ড্রাইভার হর্ন বাজানোকে অপরাধ হিসেবে মনেই করেন না।

২০০৬ সালে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা প্রণীত হয়েছিল। যার মাধ্যমে রাজধানীর বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য শব্দের গ্রহণযোগ্য স্তর নির্ধারণ করা হয়। নিরব অঞ্চলে রাতে ৪০ ডেসিবেল এবং দিনে ৫০ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দের অনুমতি রয়েছে, যা আবাসিক এলাকাগুলোর জন্য যথাক্রমে ৪৫ এবং ৫৫ ডেসিবেল পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। যেহেতু প্রতিটি গাড়ির একটি একক হর্ন থাকে তাতে তাত্ত্বিকভাবে ৪০ ডেসিবেল অতিক্রম করার কথা নয়। তবে পরিবেশগত পর্যবেক্ষণ দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, ঢাকায় প্রতিদিন হর্ন বাজানোর এই সীমা অতিক্রম করা হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এই শব্দদূষণ জনস্বাস্থ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে ৪২ শতাংশ রিকশা চালক উচ্চ শব্দের কারণে শ্রবণ সমস্যায় ভুগছেন এবং ১১.৮ শতাংশ ট্রাফিক পুলিশ প্রায় শ্রবণ ক্ষমতা হারিয়েছেন।

শব্দদূষণের সমাধান হল ধারাবাহিক ও পদ্ধতিগত পদক্ষেপ কেবলমাত্র এককালীন উদ্যোগ নয়। দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে, আইন তৈরি ও প্রয়োগ, এবং জনসচেতনতা। দুর্ভাগ্যবশত এই দুই ক্ষেত্রেই কার্যকর পদক্ষেপের অভাব। নির্দেশনা থাকতে হবে, ৪০ ডেসিবেলের বেশি শব্দ উৎপন্নকারী হর্নের আমদানি কিংবা ব্যবহার নিষিদ্ধ হবে। ডেসিবেল স্তরের মাপার যন্ত্র না থাকলে, মানুষ বুঝতে পারবেন না যে তারা ৪০ ডেসিবেল বা ৬০ ডেসিবেল হর্ন ব্যবহার করছেন কিনা। অতএব, উৎপাদন ও বিতরণ পর্যায়ে সঠিক নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন, যাতে নির্মাতাদের ৪০ ডেসিবেলের বেশি হর্ন ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে বলা হয়। অনেক উন্নত দেশ এবং আমাদের প্রতিবেশী দেশ যেমন নেপাল এবং শ্রীলঙ্কা সফলভাবে হর্ন ব্যবহার কমাতে সক্ষম হয়েছে। অনেক দেশে হর্ন ১০ ফুট দূর থেকেও অনুমিত নয়, কিন্তু বাংলাদেশে আধা কিলোমিটার বা তার বেশি দূর থেকে শোনা যায়।

হর্ন এবং লাউডস্পিকার দ্বারা সৃষ্ট শব্দদূষণের নেতিবাচক স্বাস্থ্যগত প্রভাব শুধুমাত্র শ্রবণ ক্ষতি নয়। দীর্ঘকালীন এক্সপোজারের ফলে উচ্চ রক্তচাপ, ঘুমের সমস্যা, চিড়চিড়ানো মনোভাব, এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাও দেখা দিতে পারে। শিশু এবং বয়স্ক জনগণ বিশেষ ঝুঁকিতে থাকে কারণ অতিরিক্ত শব্দ শিশুদের বিকাশে বাধা দেয় এবং বয়স্কদের জন্য হৃদরোগ বা স্ট্রোকের সম্ভাবনা বাড়ায়।পেশাগত দিক থেকে এই সমস্যায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হন রিকশাচালক, বাস ও ট্রাক ড্রাইভার এবং ট্রাফিক পুলিশ। কারণ তারা রাস্তায় সবচেয়ে বেশি সময় কাটান। তবে এই বিপদ সম্পর্কে খুব কমই সচেতনতা রয়েছে। আমরা সমস্যা এবং জরিমানা আরোপের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারি। তবে কি এটাই যথেষ্ট? নিশ্চয়ই না। একটি ব্যাপক পদক্ষেপের প্রয়োজন।

প্রথমত হর্নের জন্য জরিমানা আরোপ করা কিছু চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে। গুরুতর যানজট এবং ব্যাপক সংখ্যক যানবাহনের কারণে ড্রাইভার এবং পথচারীরা একটি শব্দময় পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। অনেক ড্রাইভার জরিমানা এড়িয়ে চলার জন্য বিপদের সময়ও হর্ন বাজাতে ভয় পাবে, যা দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাছাড়া অনেক পথচারী ফুটওভার ব্রিজ অবহেলা করে এবং অপ্রত্যাশিতভাবে রাস্তায় চলে আসে। তাই জরিমানা আরোপের আগে জনসচেতনতা ক্যাম্পেইন চালানো উচিত। পাশাপাশি ফুটওভার ব্রিজ এবং পথচারী ক্রসিং ব্যবহারের জন্য কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। প্রাথমিকভাবে উচ্চ ডেসিবেল হর্নের আমদানি এবং ব্যবহার নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। মূল কারণ সমাধান করতে হবে। যেমন অত্যন্ত শব্দযুক্ত হর্ন আমদানি বন্ধ করা, রাস্তাঘাটের উন্নতি করা, নতুন রাস্তা নির্মাণ এবং বিকল্প যানবাহন ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা করা।

বিশেষ লেন বরাদ্দ করা উচিত অ্যাম্বুলেন্স এবং জরুরি সেবা জন্য যাতে তাদের প্রতিক্রিয়া সময় কমে যায় এবং অন্যান্য যানবাহন তাদের পথ ছেড়ে দেয়। জনপরিবহন যেমন বাস, মেট্রো লাইনের সংখ্যা বাড়ানো উচিত এবং কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য এটি অপ্টিমাইজ করতে হবে। স্মার্ট ট্রাফিক সিস্টেম প্রবর্তন করা উচিত। যা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে যানবাহন এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে উন্নত করবে। কর্তৃপক্ষকে অবৈধ পার্কিংয়ের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে এবং পার্কিং এলাকার ব্যবস্থা করতে হবে। ভারী যানবাহনকে আবাসিক এলাকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হলে শব্দদূষণ এবং যানজট কমবে।






LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন