ড্যানিয়েল ডেনেটের ফোক সাইকোলজি ‘Narrative Gravity’ ও আত্মার রহস্য

ড্যানিয়েল সি ডেনেট ছিলেন এক বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন নাবিক, ভাস্কর, গায়ক, পিয়ানোবাদক, গল্পবাজ, কৌতুকপ্রিয়, তরুণ ও প্রবীণ একাডেমিকদের প্রিয় শিক্ষক, ধর্মের কঠোর সমালোচক এবং দার্শনিকদের নাম নিয়ে রচিত হাস্যরসাত্মক অভিধান ‘The Philosophical Lexicon’-এর মূল উদ্যোক্তা। তবে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি ছিলেন আধুনিক বিশ্বের অন্যতম প্রধান দার্শনিক, মন ও চেতনা নিয়ে তার চিন্তাভাবনা দার্শনিক জগতে বিপ্লব এনেছে।

ডেনেটের আগের যুগে (BD—Before Dennett), দর্শনের মূল কাজ ছিল আমাদের দৈনন্দিন ভাষা ও চিন্তাধারার বিশ্লেষণ। ‘Ordinary language philosophy’ নামে পরিচিত এই ধারায় প্রশ্ন উঠত, ‘আমার পায়ে ব্যথা আছে’—এখানে ‘আছে’ শব্দটি ঠিক কী বোঝায়? ডেনেটের পর (AD—After Dennett), দর্শন বিজ্ঞানের দিকে ঝুঁকে পড়ে, বিশেষত নিউরোসায়েন্সের দিকে। ডেনেট নিজেই বলেছিলেন, ‘মন নিয়ে ভাবতে হলে মস্তিষ্ক নিয়ে জানতে হবে।’ তার এই দৃষ্টিভঙ্গি দর্শনের জগতে এক নতুন যুগের সূচনা করে।

ডেনেটের দর্শনের মূল চাবিকাঠি ছিল ‘folk psychology’, অর্থাৎ সাধারণ মানুষের মন নিয়ে স্বাভাবিক ধারণা। আমরা সবাই ছোটবেলা থেকেই বুঝি, আমাদের ‘আমি’ আছে, ইচ্ছা, বিশ্বাস, আকাঙ্ক্ষা আছে, আমরা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারি। বিজ্ঞান কি এই ‘আমি’, বিশ্বাস বা ইচ্ছার কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে পারে? নাকি এগুলো কেবল কল্পনা?

অনেকে মনে করেন, আত্মা বা ‘self’ একটি বস্তু, হয়তো মস্তিষ্কের কোনো নির্দিষ্ট অংশ। আবার কেউ কেউ বলেন, আত্মা বলে কিছু নেই এটি নিছক কল্পনা। ডেনেট এই দুই ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করেন। তার মতে, আত্মা হচ্ছে ‘narrative gravity’—একটি বিমূর্ত বিন্দু, যার চারপাশে আমাদের জীবনের গল্প গড়ে ওঠে।

যেমন একটি চেয়ারের ‘centre of gravity’ বাস্তব হলেও সেটি চেয়ারের কোনো নির্দিষ্ট অংশ নয়, আত্মাও তেমনি কোনো নির্দিষ্ট বস্তু নয়, বরং একটি ধারণা, যা আমাদের জীবনকে অর্থ দেয়।

ডেনেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান ‘intentional stance’ তত্ত্ব। তিনি বলেন, আমরা যখন কাউকে বুঝতে চাই, তখন তাকে একটি যুক্তিসম্পন্ন এজেন্ট হিসেবে কল্পনা করি তার কী বিশ্বাস, কী চায়, সেই অনুযায়ী তার আচরণ অনুমান করি। এই পদ্ধতিই ‘intentional stance’। ডেনেটের মতে, বিশ্বাস ও ইচ্ছা আসলে আচরণগত প্যাটার্ন। এগুলো বাস্তব, তবে বস্তুগত নয়।

চেতনা নিয়ে ডেনেটের মতামত সবচেয়ে বিতর্কিত। কেউ কেউ তাকে ‘consciousness denier’ বলেন, তবে ডেনেট নিজে কখনো চেতনার অস্তিত্ব অস্বীকার করেননি। বরং তিনি দেখাতে চেয়েছেন, আমাদের চেতনার ধারণা কতটা জটিল এবং কখনো কখনো বিভ্রান্তিকর।

ড্যানিয়েল ডেনেট বিজ্ঞানের সাথে দর্শনের সংযোগ ঘটিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, মন, আত্মা, বিশ্বাস বা চেতনা এসব নিয়ে ভাবতে হলে শুধু বিজ্ঞান নয়, আমাদের দৈনন্দিন ভাষা ও গল্পও গুরুত্বপূর্ণ। তার দর্শন আমাদের শেখায়, মানুষকে বোঝার জন্য কেবল নিউরোসায়েন্স নয়, আমাদের নিজস্ব গল্প ও অভিজ্ঞতাও সমান মূল্যবান। এভাবেই ডেনেট তার দর্শন ও চিন্তাধারায় আধুনিক দর্শনের গতিপথ বদলে দিয়েছেন, একই সঙ্গে বিজ্ঞান ও মানবিকতার সেতুবন্ধন গড়ে তুলেছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন